প্রতিবছর ১০ই অক্টোবর আমরা বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসাবে পালন করি। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয় জানতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে আত্মহত্যার কারণ গুলো কি কি। পৃথিবীতে প্রতিবছর ৮ লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন পড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ জন। ১০০ জন মানুষের মধ্যে প্রতি বছর চারজন আত্মহত্যা করবে ৭ জন আত্মহত্যার পরিকল্পনা করে এবং ২০ জন আত্মহত্যা করার চিন্তা সিরিয়াসলি করে।
আত্মহত্যার কারণ
১। কৈশোরে মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ আত্মহত্যা। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে এসময়ের আবেগ, মেজাজের দিকে নজর দিতে হবে।
২। মিস্টার ডার্ক হেইম সামাজিক সমর্থন হারানোকে আত্মহত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মনে করেন। তাই সামাজিক সমর্থন বজায় রাখা ও সামাজিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা নিলে আত্মহত্যার হার কমানো যাবে।
৩। জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে যায়। যেমন যদি কেউ হঠাৎ তার চাকরি হারিয়ে ফেলে তখন তিনি ভাবতে পারেন, আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছে -আমার আর কোনো আশা নেই সবাইকে জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিকেও মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে।
৪। আবার কেউ কেউ আত্মহত্যা করে অন্যদেরকে মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়ার জন্য। যেমন যদি কেউ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে, রিজেক্ট করে বা ব্যক্তিগতভাবে আহত করে ; তাহলে তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা থেকেও আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে।তাই আঘাত পেলে বা আহত হলে বা প্রত্যাখ্যাত হলে সেটিকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে, সহজভাবে মেনে নিতে হবে।
৫। আত্মহত্যার আরেকটি কারণ বংশগতির প্রভাব। দেখা গেছে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করার ঝুঁকি ৬ গুণ বেশি থাকে।
৬। নিউরো বায়োলজিক্যাল: কারণেও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে পারে। যেমন সেরো টনিনের মাত্রা খুবই কম থাকলে, আবেগ তাড়িত কাজ করার ঝুঁকি বাড়ে এবং মানসিক বিপর্যয়ের কারণে মনোবল হারালে তখন তারা আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে।
৭। তবে আত্মহত্যার প্রধান কারণ মানসিক রোগ : যারা আত্মহত্যা করে তাদের ৮০% পার্সেন্ট বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগে থাকে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন।
৮।“ নৈরাশ্য বা আশাহীনতা “ হচ্ছে সুনির্দিষ্ট উপাদান, যার জন্য মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
যেমন মানুষ যখন মনে করে তারা অন্যদের জন্য বোঝা এবং অন্যদের সঙ্গে তারা অংশ ভুক্ত নন বা অন্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কম - তখন তাদের ভিতর হতাশা কাজ করে। তাই তারা আত্মহত্যা চিন্তাও করতে পারে।
৯। এছাড়াও যদি কেউ কোন লজ্জাজনক, অপমানজন, কলঙ্কজনক, মানহানি কর, পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে, তখন আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। তাই জীবন অভিজ্ঞকে সহজভাবে মেনে নিয়ে ও মানিয়ে নিয়ে চলতে শিখতে হবে।
আত্মহত্যার প্রতিকার
১. মানসিক কষ্টে থাকা ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
২. তাকে একা না রেখে পরিবার ও বন্ধুদের পাশে থাকার চেষ্টা করুন।
৩. হতাশা বা আত্মহত্যার কথা বললে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেবেন না।
৪. প্রয়োজন হলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
৫. পরিবারে সহানুভূতিশীল ও খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করুন।
৬. মাদকাসক্তি ও সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে উৎসাহ দিন।
৭. স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ান।
লেখক
অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম
মনোচিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও ব্রেইন স্পেশাস্টি
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০ |
