পেটে ব্যথা হলে অনেকেই সেটিকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বলে ধরে নেন। আবার জন্ডিস হলে কেউ কেউ ঘরোয়া চিকিৎসা বা ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে পিত্তনালী (Bile duct) বা লিভারের ভেতরের পিত্তনালীতে পাথর, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে মারাত্মক জটিলতা এমনকি জীবনহানির কারণও হতে পারে।
পিত্তনালী ও লিভারের পাথর কী?
লিভার প্রতিনিয়ত পিত্তরস তৈরি করে, যা পিত্তনালীর মাধ্যমে পিত্তথলিতে জমা থাকে এবং পরে খাবার হজমে সাহায্য করে। অনেক সময় পিত্তথলির পাথর প্রধান পিত্তনালীতে এসে আটকে যায়। এটিই পিত্তনালীর পাথর। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিভারের ভেতরের ছোট পিত্তনালীতেও পাথর তৈরি হতে পারে, যাকে হেপাটোলিথিয়াসিস বলা হয়।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
সব রোগীর একই ধরনের উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে সাধারণত দেখা যায়—
১. ডান পাশের ওপরের পেটে তীব্র বা বারবার ব্যথা
২. চোখ ও শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
৩. জ্বর ও কাঁপুনি
৪. গাঢ় রঙের প্রস্রাব
৫. ফ্যাকাশে বা সাদা রঙের পায়খানা
৬. বমি বমি ভাব বা বমি
৭. সারা শরীরে চুলকানি
বিশেষ করে জ্বর, জন্ডিস ও পেটব্যথা একসঙ্গে থাকলে এটি পিত্তনালীর সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি।
কেন এই রোগ বিপজ্জনক?
পিত্তনালীতে পাথর আটকে গেলে পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সংক্রমণ, রক্তে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া (সেপসিস), অগ্ন্যাশয়ের তীব্র প্রদাহ (অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস), লিভারে ফোঁড়া, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে লিভারের স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে। তাই এই রোগকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের পরীক্ষা, লিভার ফাংশন টেস্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এমআরসিপি (MRCP) এবং প্রয়োজনে ইআরসিপি (ERCP) করা হয়।
চিকিৎসা কী ?
বর্তমানে অধিকাংশ পিত্তনালীর পাথর ERCP নামক আধুনিক এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে অপসারণ করা যায়। এতে পেট কাটার প্রয়োজন হয় না। পরে প্রয়োজনে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে। লিভারের ভেতরের পাথরের ক্ষেত্রে রোগের অবস্থান ও জটিলতা অনুযায়ী ERCP, বিশেষ এন্ডোস্কোপিক বা রেডিওলজিক্যাল পদ্ধতি, অথবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে ?
১. যাদের পিত্তথলিতে আগে থেকেই পাথর রয়েছে
২. নারীরা, বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সে
৩. অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
৪. ডায়াবেটিস রোগী
৫. দ্রুত ওজন কমানো ব্যক্তিরা
৬. দীর্ঘদিনের পিত্তনালীর সংক্রমণে ভোগা রোগী
প্রতিরোধে কী করবেন ?
১. স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
২. নিয়মিত ব্যায়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
৪. পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
৫. জন্ডিস, জ্বর বা তীব্র পেটব্যথাকে কখনো অবহেলা করবেন না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা অনেকে জন্ডিস বা পিত্তনালীর সমস্যায় বিভিন্ন ধরনের ভেষজ বা অপ্রমাণিত চিকিৎসার আশ্রয় নেন। এতে রোগ ভালো হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় আরও জটিল হয়ে যায় এবং মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন সার্জন বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। মনে রাখবেন, পিত্তনালী ও লিভারের পাথর এখন আর দুরারোগ্য নয়। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন ফিরে পান। সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং নিয়মিত ফলো-আপই পারে এই রোগের জটিলতা থেকে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে।
লেখক
ডা: মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান
সহকারী অধ্যাপক, সার্জারী বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
চেম্বার: আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
