বিএমইউতে সফলভাবে ৬ রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন

বিএমইউতে সফলভাবে ৬ রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন

ফন্ট সাইজ:

দেশেই জটিল চিকিৎসায় অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। সমপ্রতি বিএমইউ’র সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৬টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ৪টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য রোগীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া এখন থেকে প্রতি মাসে ২টি করে এ ধরনের রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করারও পরিকল্পনা নিয়েছে বিএমইউ। গতকাল সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএমইউ’র ভিসি অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট চিকিৎসায় দেশে এক নতুন যুগের সূচনা দাবি করে তিনি আরও জানান, একই সঙ্গে এই সাফল্য জটিল চিকিৎসায় একটি সফল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এই ৬টি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে গত ১লা ও ২রা সেপ্টেম্বর ২০২৫ এবং ৩রা ও ৪ঠা জুলাই ও ১১ ও ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। সরকারি বরাদ্দের আওতায় রোগীদের এসব ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিনামূল্যে করা হয়েছে। সকল লিভার গ্রহীতা রোগী ও লিভার দাতারা ভালো আছেন। বিএমইউ’র হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি, হেপাটোলজি এবং অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগসহ মোট ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এসব সার্জারি সম্পন্ন হয়। এই সকল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করতে হায়দ্রাবাদস্থ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ এন্টারোলজি (এআইজি) হসপিটাল-এর বিশেষজ্ঞ ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিম বিএমইউ’র চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করেছেন।

অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী জানান, এ সকল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করার আগে দাতা ও গ্রহীতার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং আইনগত ও নৈতিক বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে রোগীদের পরবর্তী চিকিৎসা ও ফলোআপ চলছে। বিএমইউ কর্তৃপক্ষ মনে করে ধারাবাহিক এই কার্যক্রম দেশে উন্নত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট চিকিৎসাসেবা সমপ্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের রোগীদের ও মানুষকে আমরা একটি সুসংবাদ দিতে চাই তা হলো, দেশেই অত্যন্ত জটিল চিকিৎসা যার সঙ্গে মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিভাগসমূহ সম্পৃক্ত যেমন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট এখন দেশেই করা সম্ভব। বিএমইউতে সমপ্রতি ৪ জনসহ এক বছরের মধ্যে ৬ জন রোগীর সফলভাবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিচ্ছিন্নভাবে ২টি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। বিএমইউ বর্তমান প্রশাসন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমকে একটি স্থায়ী ও গতিশীল রূপ দিতে বিশেষ কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছে। লিভার ট্রন্সপ্ল্যান্ট সার্জারির জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি এপ্রোচ নিয়ে একটি দক্ষ টিমওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।

বিএমইউ লক্ষ্য মাসে ২টি এবং বছরে ২৪টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করা। বিএমইউ’র বর্তমান প্রশাসন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসাসেবায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে এবং দেশের রোগীদের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ জন্য সাংবাদিকদের ইতিবাচক ভূমিকা কাম্য। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেবায় বিদেশে এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশে করলেও কোটি টাকা ব্যয় হয়। বাংলাদেশে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কমবেশি ৩০ লাখ টাকার মতো ব্যয় হবে। দেশে রোগীরা বিএমইউ’র ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম সেবা নিতে পারেন এবং এ জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। বিএমইউ’র সাবেক ভিসি ও হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, দেশে লিভারে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি মানুষ।

বাংলাদেশে বছরে কমপক্ষে ১ হাজার রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা প্রয়োজন। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে রোগী দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকে এবং তার শারীরিক কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক থাকে। প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, লিভার ট্রন্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সেবা অব্যাহত ও গতিশীল রাখতে প্রয়োজনে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হাব তৈরি করা হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার পর সুস্থ হওয়া ব্যবসায়ী কবির হোসেন। মানবজমিনকে বলেন, এই রোগ নিয়ে দু’বছর ভুগছিলেন তিনি। আলহামদুলিল্লাহ এখন ভালো আছি। তার বড় মেয়েই তার ডোনার ছিলেন। মেয়ে হুমাইয়া কবির জানান, তিনিও এখন সুস্থ আছেন। লিভার দেয়ার পর ১২ দিন পরই স্বাভাবিক কাজ করতে পেরেছেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউ’র ডিন ও পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।