বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিধি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, নতুন নতুন বিষয় ও একাডেমিক প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ এখন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই বিস্তারের সাথে সাথে একটি মৌলিক প্রশ্নও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমরা কি শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াচ্ছি, নাকি একই সাথে শিক্ষার মানও নিশ্চিত করতে পারছি?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো বা কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কী শিখল, কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করল এবং সেই জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে কর্মজীবন ও সমাজে কতটা অবদান রাখতে পারল — সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আসে। অ্যাক্রেডিটেশন (Accreditation) শব্দটি অনেকের কাছে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। সহজভাবে বললে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা তার কোনো একাডেমিক প্রোগ্রাম নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে কি না এবং প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে নিজের মান উন্নত করছে কি না— এসব বিষয় একটি নিরপেক্ষ ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন করাই অ্যাক্রেডিটেশনের মূল উদ্দেশ্য।
একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম মানসম্পন্ন কি না, তা বোঝার জন্য শুধু শ্রেণিকক্ষ থাকলেই হয় না। প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, সময়োপযোগী curriculum, কার্যকর teaching-learning process, যথায assessment system, প্রয়োজনীয় laboratory ও অন্যান্য facilities, গবেষণার সুযোগ এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত learning outcomes অর্জনের নিশ্চয়তা।
অর্থাৎ অ্যাক্রেডিটেশনের প্রশ্নটি মূলত একটি প্রশ্নকে ঘিরেই— একটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবে কি তা যথাযথভাবে দিতে পারছে? তবে অ্যাক্রেডিটেশন সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। এটিকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক প্রোগ্রামের জন্য নিজের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে আরও উন্নত হওয়ার সুযোগ।
সাধারণত অ্যাক্রেডিটেশনের প্রক্রিয়ায় প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রোগ্রাম নিজেই নিজের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে। এটিকে বলা হয় Self-Assessment। এরপর নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে External Reviwe বা বাহ্যিক মূল্যায়ন করা হয়। এসব মূল্যায়ন ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অ্যাক্রেডিটেশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তাই অ্যাক্রেডিটেশন কোনো এককালীন পরীক্ষা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া—নিজেকে জানা → দুর্বলতা চিহ্নিত করা → উন্নয়ন পরিকল্পনা করা → বাস্তবায়ন করা → পুনরায় মূল্যায়ন করা। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে quality culture বা গুণগত মানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
অ্যাক্রেডিটেশনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন সে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য কয়েকটি বছর ব্যয় করে না; সে তার ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করে। একইভাবে একজন অভিভাবকও সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য অর্থ, সময় ও প্রত্যাশা বিনিয়োগ করেন। তাই শিক্ষার্থীর জানার অধিকার রয়েছে—সে যে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রামে পড়ছে, সেখানে শিক্ষার মান কেমন।
একটি মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রোগ্রামের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা, যারা শুধু একটি সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বের হবে না; বরং তাদের থাকবে জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, যোগাযোগক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা।
বর্তমান বিশ্বে শুধু একটি ডিগ্রি চাকরির বাজারে সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, নতুন ধরনের কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে গ্র্যাজুয়েটদের ক্রমাগত নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে। সুতরাং আমাদের উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত “degree-producing system” থেকে “competency-producing system”-এ পরিণত হওয়া।
উচ্চশিক্ষার মানের সাথে কর্মসংস্থানের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হচ্ছে, তা যদি কর্মজগতের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার বিস্তারও কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনবে না। এ কারণে curriculum-কে সময়োপযোগী করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধান, যুক্তিগত দক্ষতা, communication, teamwork, critical thinking এবং innovation-এর সুযোগ দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও industry-এর মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কর্মজগতের পরিবর্তিত চাহিদা curriculum development এবং learning outcomes নির্ধারণে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। একই সাথে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উচ্চশিক্ষার মূলধারায় আরও শক্তিশালীভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান গ্রহণ করে না; নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রয়োজন থেকেই Bangladesh Accreditation Council (BAC) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Bangladesh Accreditation Council Act, 2017-এর মাধ্যমে।
Bangladesh Accreditation Council (BAC)-এর কাজকে শুধু accreditation certificate প্রদানের বিষয় হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি বোঝা যাবে না। এর মূল লক্ষ্যই হলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একটি টেকসই quality culture গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের Institutional Quality Assurance Cell (IQAC)-কে আরও কার্যকর করতে হবে। তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা, curriculum moderniæation, শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশাসন এবং industry-এর সাথে কার্যকর যোগাযোগ—সবকিছুকেই quality assurance-এর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
উচ্চশিক্ষা এখন কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, শিক্ষক ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশ নিচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে এবং বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারেও প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া অপরিহার্য।
একটি শক্তিশালী জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা শিক্ষার মান সম্পর্কে আস্থা তৈরিতে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক academic collaboration, credit transfer, joint programme, research collaboration এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো নয়; বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই হলো বড় চ্যালেঞ্জ। অ্যাক্রেডিটেশনকে যদি আমরা কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা বাহ্যিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখি, তাহলে এর প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন। কিন্তু যদি এটিকে নিজেদের উন্নয়নের একটি আয়না হিসেবে দেখি, তাহলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন যে ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে তা অসাধারণ।
বাংলাদেশে এখন আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন—এমনটি নয়; প্রয়োজন হলো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু বেশি গ্র্যাজুয়েট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য গ্র্যাজুয়েট। শুধু জাতীয় পর্যায়ে ডিগ্রির স্বীকৃতি নয়; প্রয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শিক্ষা। আর শুধু অ্যাক্রেডিটেশনের সংখ্যা বাড়ানো নয়; প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে quality culture তৈরি করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতার ওপর। আর সেই তরুণদের প্রস্তুত করার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে একজন গ্র্যাজুয়েট আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারে — “আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তার মান নিয়ে আমি গর্বিত।”
আমরা এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যার ডিগ্রি শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিশ্বজুড়েও আস্থা ও সম্মানের সাথে বিবেচিত হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথ দীর্ঘ। কিন্তু পথটি শুরু করতে হবে আজই—উচ্চশিক্ষার বিস্তার থেকে উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষের দিকে।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল।
