বিসমিল্লাহ টি-স্টলের বেঞ্চিতে বসে মোতালেব সাহেবের মেজাজ আজ ৪৪০ ভোল্ট। বাজারে গিয়ে ব্রয়লার মুরগি আর কাঁচামরিচের দাম শুনে তার মনে হয়েছে, দেশের মুরগিগুলো বোধহয় আজকাল সোনার ডিম পাড়ছে আর কৃষকরা মরিচের গাছে ইউরিয়ার বদলে সোনাদানা ছিটাচ্ছে। দোকানে এসেই তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সরকারের মুণ্ডুপাত শুরু করলেন, ‘আরে ভাই, এই সরকার আসলো, ভাবলাম দেশটা বোধহয় রাতারাতি প্যারিস হয়ে যাবে। কিন্তু এই সাত-আট মাসেই তো পকেট গড়ের মাঠ! এরা তো কিছুই পারতেছে না! খালি কথা আর কথা।’
পাশের বেঞ্চিতে বসে শান্ত মেজাজে চায়ে টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে খাচ্ছিলেন পাড়ার প্রবীণ দার্শনিক কুদ্দুস ভাই। বিস্কুটটা অর্ধেক গলে চায়ের কাপে খসে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি সেটা মুখে পুরে দিলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বললেন, ‘মোতালেব মিয়া, তোমার সমস্যা হলো তুমি রকেট গতিতে রেজাল্ট চাও। আরে ভাই, একটা নতুন বউ ঘরে আনলেও তো তার হাতের রান্না মুখে রুচতে আর সংসারের নিয়ম বুঝতে অন্তত ছয়-সাত মাস লাগে। আর এটা তো একটা আস্ত দেশ! মাত্র সাত-আট মাস হলো এরা ক্ষমতায় এসেছে। এখনই তুমি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলে?’
মোতালেব সাহেব চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘সাত-আট মাস কি কম সময় নাকি? এত দিনে তো একটা বিল্ডিংয়ের তিন তলার ছাদ ঢালাই হয়ে যায়!’
কুদ্দুস ভাই হাসলেন। ‘নতুন বিল্ডিং তুললে তো তা-ই হয়। কিন্তু এই সরকার তো আর ফাঁকা প্লটে বিল্ডিং তুলছে না। তারা উঠেছে একটা পুরোনো, জরাজীর্ণ, ইঁদুর-তেলাপোকায় ভরা ভাড়াবাড়িতে। আগের ভাড়াটিয়ারা বাথরুমের কল ভেঙেছে, ছাদ ফুটো করেছে, আর ইলেকট্রিকের তার সব কেটেকুটে রেখে গেছে। তুমি কি প্রথম দিনেই সেখানে ফাইভ-স্টার হোটেলের ফিলিংস পাবা? আগে তো ব্লিচিং পাউডার ছড়াতে হবে, জঞ্জাল সরাতে হবে, কলমিস্ত্রি ডাকতে হবে। সরকার এখন সেই ব্লিচিং পাউডার ছড়াচ্ছে। ইঁদুরগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে দেখেই তোমার মনে হচ্ছে বাজারে আগুন, ঝামেলা বেড়েছে। কিন্তু আসলে তো সাফাই অভিযান চলছে! জঞ্জাল পরিষ্কার করতেই তো সাত-আট মাস যাওয়ার কথা।’
দোকানের তরুণ শ্রোতা রফিক সায় দিয়ে বলল, ‘কুদ্দুস ভাই ঠিকই বলেছেন। আমরা বাংলাদেশিরা একটু বেশিই অধৈর্য। আমরা চাই আজ রাতে সরকার শপথ নেবে, আর কাল সকালে উঠে দেখবো আমার রাস্তায় কোনো জ্যাম নাই, বাজারে জিনিসপত্র ফ্রি দিচ্ছে, আর অফিসের বস আমাকে দেখে সালাম দিচ্ছে! সরকারের অবস্থা এখন সেই ছাত্রের মতো, যে পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে আগের বেঞ্চের ছেলেটা তার খাতায় হিজিবিজি এঁকে রেখে গেছে। এখন সে রাবার দিয়ে সেই হিজিবিজি মুছবে, নাকি নিজের পরীক্ষা দেবে? হিজিবিজি মুছতেই তো বেচারাদের ঘাম ছুটে যাচ্ছে!’
কুদ্দুস ভাই চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আসল কথায় আসলেন। ‘‘দেখো মোতালেব, এই সাত-আট মাসে সরকার যে একদম কিছু করেনি, তা তো না। কিছু তো ভালো উদ্যোগ নিচ্ছে। আগের মতো কেউ বুক ফুলিয়ে বলছে না যে ‘আমি পুকুর চুরি করেছি, পারলে ধরো’। এখন চুরি করলেও অন্তত ভয়ে ভয়ে করছে, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ডিজিটাল সিস্টেমে কিছু স্বচ্ছতা আনার চেষ্টাও তো চোখে পড়ছে। একটা ভাঙা গাড়ি স্টার্ট দিতে তো একটু সময় লাগেই, ধাক্কা তো দিচ্ছে তারা। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো-আমাদের দেশের রাজনীতির সেই গোল্ডেন রুলটা ভুলে গেলে? ‘সরকার সঠিক করলেও পাঁচ বছর, বেঠিক করলেও পাঁচ বছর!’’
মোতালেব সাহেব একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, ‘তার মানে?’। ‘তার মানে খুব সোজা,’ কুদ্দুস ভাই দার্শনিক হাসি দিলেন। ‘‘এটা হলো নন-রিফান্ডেবল পলিসি। তুমি ভোট দিয়ে (বা না দিয়ে) গদিতে বসিয়েছ, এখন তো আর ‘মানি ব্যাক গ্যারান্টি’ নাই যে সাত মাস পর বলবা-ভাই, আপনাদের সার্ভিস পছন্দ হয়নি, চেঞ্জ করে দেন! উনাদের একটা পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছে। তারা যদি এই পাঁচ বছরে দেশকে টেনে তুলে একদম সিঙ্গাপুর বানিয়ে ফেলে, তাও তারা পাঁচ বছরই থাকবে। আর যদি অর্থনীতিকে আইসিইউতে পাঠিয়ে দেয়, তাও ওই পাঁচ বছরই। তুমি চিল্লালেও পাঁচ বছর, প্রশংসা করলেও পাঁচ বছর।’’
মোতালেব সাহেব এবার একটু নরম হলেন। যুক্তিগুলো একেবারে ফেলার মতো নয়। সত্যিই তো, এত দিনের জমে থাকা সিস্টেমের জঞ্জাল কি আর জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় সাত মাসে ঠিক হয়? তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তা যা বলেছেন! বেটারা তো পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্ট সাইন করেই মাঠে নেমেছে। আর কেবল তো ওয়ার্মআপ চলছে। এখনই এত চিল্লাপাল্লা করে তো লাভ নাই।’
‘একদম তাই!’ রফিক হাসিমুখে বলল। ‘সরকার সঠিক পথে হাঁটুক আর বেঠিক পথে-চুক্তি যেহেতু পাঁচ বছরের, তাই দর্শক হিসেবে আমাদের একটু ধৈর্য ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রেশার না বাড়িয়ে সরকারের ওপর একটু ভরসা রাখেন আঙ্কেল। কেবল তো ট্রেইলার রিলিজ হলো সাত-আট মাসে। সিনেমা তো এখনো বাকি। ভালো হলে শেষে দাঁড়িয়ে হাততালি দেব, আর বেঠিক হলে...ওই যে বললাম, পাঁচ বছর তো তাদের সরাবে কে! আপাতত চা খান আর দেখেন, এই ভাঙা গাড়ি সরকার কীভাবে ঠেলে ঠেলে স্টার্ট দেয়।’
মোতালেব সাহেব মুচকি হেসে দোকানিকে ডাক দিলেন, ‘এই জামাল, প্রেশার তো কিছুটা কমলো। দে তো বাবা, আরেক কাপ কড়া লাল চা দে। পাঁচ বছরের সিনেমায় কেবল সাত মাস গেল, বাকি চার বছর তো এই লাল চা খেয়েই পার করতে হবে!’
