জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বনেতাদের কূটনৈতিক আলোচনার মঞ্চ । সমকালীন বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি ও একটি দেশের আত্মপ্রকাশের এক ঐতিহাসিক আয়না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রতিটি স্বাধীন দেশ এই মঞ্চে নিজেদের সম্ভাবনাগুলোকে তুলে ধরছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসেও এই বৈশ্বিক মঞ্চের ভূমিকা অনন্য।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সর্বশেষ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দপ্তরে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে জাইমা রহমান এই চারজনের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও নীতির এক নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার গল্প বলে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন যুগের পর যুগ একই পরিবারের সদস্যরাই বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের নীতির ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি পরিবারের অবদানকে অনন্য স্বীকৃতি এনে দেয় ।
জাতিসংঘে জিয়া পরিবারের প্রথম পদচারণা ঘটে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন। সময়টা ছিল বিশ্ব অর্থনীতির এক চরম ক্রান্তিকাল। দ্বিতীয় তেল সংকটের জেরে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তখন মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে ছিল।
জিয়াউর রহমানের ভাষণের সবচেয়ে দূরদর্শী দিক ছিল 'স্বনির্ভরতা' (Self-reliance)। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু বিদেশি সাহায্যের ওপর ভর করে একটি সদ্য স্বাধীন দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তিনি খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার এক বাস্তবসম্মত রূপরেখা তুলে ধরেন। তাঁর এই স্বনির্ভরতা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ছিল না, বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ প্রত্যয় ছিল। পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার যে শক্তিশালী বীজ বপন করেছিলেন, তা-ই পরে সার্ক (SAARC) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা তাঁর গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই প্রমাণ।
১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে ভাষণ দেন খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদ ও এর অঙ্গসংগঠনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
তিনি কেবল সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে নয়, 'দায়িত্বশীল রাষ্ট্র' হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষণগুলোতে নারী শিক্ষা, শিশুস্বাস্থ্য এবং বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশের অনবদ্য অবদানের কথা বেশ গুরুত্ব পায়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে সক্ষম হন যে, বাংলাদেশ নিজের সংকট মোকাবিলাই করছে না, বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠাতেও সমানভাবে অবদান রাখছে।
জিয়া পরিবারের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির তৃতীয় অধ্যায়টি রচিত হয় ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আধুনিক এক ভাষণ দেন। তিনি দেশ পুনর্গঠনের জন্য 'থ্রি-আর' (Recovery, Restoration and Reconstruction) কৌশলের কথা জানান এবং তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা শোনান।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ডের মতো সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ভবিষ্যতে এগুলো মিলিয়ে একটি 'ইউনিভার্সাল কার্ড' চালু করা হবে, যা 'অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ'-এর এক চমৎকার উদ্যোগ। তিনি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২৫ কোটি গাছ লাগানোর ঘোষণাই দেননি, বরং বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন 'এআই ডিভাইড' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈষম্য নিয়ে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নেতৃত্ব এখন একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত।
পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আগের তিনজনের চেয়ে ভিন্নমাত্রার। তিনি কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের দপ্তরে 'লিগ্যাল অফিসার' হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় শিক্ষিত জাইমা রহমান উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক সমন্বয় ও নীতি-নির্ধারণী কার্যক্রমে সরাসরি আইনি সহায়তা দিচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের একজন মেধাবী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর এই অন্তর্ভুক্তি জিয়া পরিবার এর রাজনৈতিক নেতৃত্বেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রশাসনের পেশাদার জায়গাতেও নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মের এমন সফল ও দাপুটে উপস্থিতির উদাহরণ বিশ্বে বিরল নয়। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বংশগত ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের পরিচিতি ও প্রভাবকে সুদৃঢ় করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন এই রাজনৈতিক পরিবারের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ১৯৪৭ সালের পর জাতিসংঘে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন, যেখানে তিনি উপনিবেশবাদের অবসানের ডাক দেন। তবে জাতিসংঘে এই পরিবারের সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল নেহেরুর বোন বিজয়া লক্ষ্মী পণ্ডিতের উপস্থিতি। ১৯৫৩ সালে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮ম অধিবেশনের 'প্রথম নারী সভাপতি' হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীও বিশ্বমঞ্চে ভারতের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবারের উপস্থিতি অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং স্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নাটকীয় ভাষণ দেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার তীব্র সমালোচনা করে তাঁর কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। তাঁর পরবর্তীতে তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জোরালো বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।
জাতিসংঘে জিয়া পরিবারের এই চার দশকের যাত্রা বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অসামান্য মিশ্র দলিল। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যে 'স্বনির্ভর' বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে তারেক রহমান ঠিক সেই মঞ্চেই দাঁড়িয়ে একুশ শতকের 'এআই ডিভাইড' বা প্রযুক্তিগত সমতার দাবি তুলেছেন। নীতির এই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।
তবে বংশতান্ত্রিক রাজনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোকে আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বমঞ্চে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের এই দাপট প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এখনো ব্যক্তি বা পরিবারের ঊর্ধ্বে উঠে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়তে পারিনি। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে যদি বিশ্বমঞ্চে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়, তবে রাজনৈতিক আভিজাত্যের এই ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে মেধাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। (মতামত লেখকের নিজস্ব)
জাতিসংঘে বাংলাদেশের এক পরিবারের চার প্রজন্ম
আবু জুবায়ের
মত-মতান্তর
৫৬ মিনিট আগে
২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার), ২০২৬, ৫ঃ৪৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
