বাংলাদেশে আজ প্রশ্নটি আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের বিষয় নয়—এটি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাস্তায় ছিনতাই, এলাকায় কিশোর গ্যাং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উন্মত্ততা, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, সর্বত্র দুর্নীতির সংস্কৃতি এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতা দেখে অনেকেই জানতে চান, রাষ্ট্র ব্যর্থ, নাকি নাগরিক? কঠিন সত্য হলো, উভয়ই ব্যর্থ। তবে দায় সমান নয়।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষা করা। যখন মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত মনে করতে পারে না, যখন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি আলোচিত হয়, যখন আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন রাষ্ট্রকে দায় নিতেই হবে। কারণ আইনশৃঙ্খলা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের সাফল্যের ভিত্তি শুধু অর্থনীতি নয়, আইনের শাসন। সেখানে মানুষ আইন মেনে চলে কেবল নৈতিকতার কারণে নয়, বরং তারা জানে আইন ভাঙলে নিশ্চিত জবাবদিহি করতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল। আর যখন নাগরিকের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্বও ক্ষয় হতে শুরু করে। কিন্তু সব দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নাগরিকদের নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ নেই।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অনেকেই নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করে। ঘুষকে "ম্যানেজ", প্রভাব খাটানোকে "ক্ষমতা" এবং কর ফাঁকিকে "চাতুর্য" হিসেবে দেখা হয়। একজন দুর্নীতিবাজকে সামাজিকভাবে বর্জন করার পরিবর্তে অনেক সময় তার অর্থ ও প্রতিপত্তিকে সম্মান করা হয়। ফলে দুর্নীতি রাষ্ট্রের অফিস থেকে বের হয়ে সমাজের রক্তধারায় মিশে যাচ্ছে। এই নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার নতুন প্রজন্ম।
আজকের বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং শুধু অপরাধের সমস্যা নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ের ব্যর্থতার প্রতীক। স্কুলপড়ুয়া কিশোররা যখন বইয়ের বদলে অস্ত্রের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রভাব দেখাতে চায়, যখন বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে গ্যাং সংস্কৃতি, যখন পরিচয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায় সহিংসতা, তখন বুঝতে হবে কোথাও গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
যে রাষ্ট্র তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, পাঠাগার, কাউন্সেলিং ও সৃজনশীল বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারে না, সেই রাষ্ট্র ব্যর্থ। আবার যে পরিবার সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তার মানসিক বিকাশের খোঁজ রাখে না, যে সমাজ অর্থ ও বাহাদুরিকে চরিত্রের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়, সেই সমাজও ব্যর্থ।
আরও উদ্বেগজনক হলো কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবক্ষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের সামনে এমন এক কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে জনপ্রিয়তা মানেই সাফল্য, বিলাসিতা মানেই সম্মান এবং ভাইরাল হওয়াই যেন জীবনের লক্ষ্য। অনলাইন বুলিং, অশালীন কনটেন্ট, সহিংসতার গৌরবগান এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা অনেক তরুণকে ক্রমশ অস্থির, অসহিষ্ণু ও হতাশ করে তুলছে। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত পরীক্ষার নম্বর নিয়ে ব্যস্ত; মানুষ গড়ার শিক্ষা সেখানে অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা শুধু চাকরির প্রস্তুতি নয়, নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া। সেখানে শিশুদের শেখানো হয় শৃঙ্খলা, দায়িত্ব, সহনশীলতা, আইন মান্যতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। বাংলাদেশে আমরা শিক্ষিত জনসংখ্যা বাড়িয়েছি, কিন্তু মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
রাজনীতির চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়।
গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য মতের ভিন্নতা, কিন্তু শত্রুতা নয়। অথচ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সমালোচনা অনেক সময় রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়, আবার ক্ষমতার পরিবর্তনকে নীতির পরিবর্তনের বদলে প্রতিশোধের রাজনীতিতে রূপ দেয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। ফলে সমাজে বিভাজন বাড়ে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং নাগরিকের আস্থা কমে যায়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নানা সাফল্য থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। উন্নয়ন যদি কেবল সেতু, মেট্রোরেল বা আকাশচুম্বী ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তরুণদের কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বাস্তবতা হলো, একটি দেশের পতন একদিনে হয় না। এটি শুরু হয় যখন দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে যায়, যখন মেধার চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে ওঠে, যখন আইনকে ভয় নয় বরং উপহাস করা হয়, যখন তরুণদের স্বপ্নের জায়গা দখল করে হতাশা, যখন নাগরিক দায়িত্ববোধের জায়গা নেয় আত্মস্বার্থ।
তাই প্রশ্নটি "রাষ্ট্র ব্যর্থ নাকি নাগরিক ব্যর্থ" নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কেন রাষ্ট্র এমন পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হলো যেখানে সৎ থাকা লাভজনক, আইন মানা সম্মানের এবং অপরাধ করা ঝুঁকিপূর্ণ? একই সঙ্গে কেন নাগরিক সমাজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে দায়িত্বের চেয়ে অধিকারের দাবি বেশি, নৈতিকতার চেয়ে সুবিধাবাদ বেশি এবং সত্যের চেয়ে দলীয় অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের সংকট মূলত আস্থার সংকট, মূল্যবোধের সংকট এবং জবাবদিহির সংকট।
একটি দেশে যখন কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ঘটে, দুর্নীতি সামাজিক মর্যাদায় রূপ নেয়, রাজনৈতিক বিভাজন জাতীয় স্বার্থকে গ্রাস করে এবং সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন সেটি কেবল সরকারের ব্যর্থতা নয়, পুরো জাতির জন্য বিপদসংকেত।
তবে শেষ কথা একটাই: নাগরিকের ব্যর্থতার পেছনে রাষ্ট্রের দায় খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পেছনে কোনো অজুহাত খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ একটি জাতিকে সৎ, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল করে তোলার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে অবক্ষয় শুধু সমাজে নয়, রাষ্ট্রের ভিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
আর সেই মুহূর্তে প্রশ্ন থাকে না, "রাষ্ট্র ব্যর্থ, নাকি নাগরিক?" প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আমরা কি ধীরে ধীরে একটি দায়িত্বহীন রাষ্ট্র এবং দিশাহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই মেইল: [email protected]
বাংলাদেশের অবক্ষয়ের দায় কার?
সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
মত-মতান্তর
৩৫ মিনিট আগে
২৩ সেপ্টেম্বর (বুধবার), ২০২৬, ৪ঃ৪৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
