ছোট্ট আনুষ্ঠানিক বহর, নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট আর হাতে মাত্র চার দিন। সময় স্বল্প, কিন্তু লক্ষ্য ও কর্মসূচি বিস্তৃত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের মূল উদ্দেশ্য শুধু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরা নয়, একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও জাতীয় স্বার্থের অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে স্পষ্ট করা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, জলবায়ু ন্যায্যতা ও অর্থায়নের দাবি তুলে ধরা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা। এর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক রয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের এই সফরে তাই আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে কূটনৈতিক লক্ষ্যই বড়। ৩৫ সদস্যের সীমিত সফরসঙ্গী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগানোর একটি সুস্পষ্ট কৌশল নিয়েই নিউইয়র্কে পা রেখেছেন।
কিছু সফর কেবল রাষ্ট্রীয় সফর নয়, সময়ের পাতায় তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। কিছু যাত্রা কেবল একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বিদেশযাত্রা নয়, তার সঙ্গে বহন করে একটি জাতির প্রত্যাশা, একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের যাত্রা তেমনই একটি অধ্যায়।
২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। ২২শে সেপ্টেম্বর থেকেই তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। ২৩শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। পরে তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। এই দিন সকালে সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব অনুষ্ঠানে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী।
সময়ের হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সফরটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য নিঃসন্দেহে বড়। কারণ, জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে এবার একটি পরিবারের ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই পরিবারের তিন সদস্য, তিন ভিন্ন সময়, তিন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কথা বলার জন্য একই বিশ্বমঞ্চ।
১৯৮০ সালের ২৬শে আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ এক উপস্থিতি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের দারিদ্র্য, জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা, খাদ্য ও উন্নয়ন-সংকট। একই সঙ্গে তিনি আত্মনির্ভর উন্নয়ন, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতা ও শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও তাঁর সেই ভাষণের রেকর্ড রয়েছে।
তেরো বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১লা অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে ভাষণ দেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, শান্তি ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। পরবর্তী সময়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত গঙ্গার পানি ও ফারাক্কা প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি জাতিসংঘের সংস্কার, আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা এবং ছোট ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ন্যায্য অধিকার নিয়েও বক্তব্য দেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতিসংঘ ভাষণে ছিল সদ্য স্বাধীন, উন্নয়ন-সংকটে থাকা একটি বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে ছিল গণতন্ত্র, জাতীয় স্বার্থ, পানি ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মতো প্রশ্ন। আর চার দশকেরও বেশি সময় পর তারেক রহমানের সামনে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এবারের বাংলাদেশ একটি পরিবর্তিত বিশ্বে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে নতুন নতুন প্রশ্ন।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের নবায়িত গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় তুলে ধরবেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।
এখানেই এবারের সফরের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে উঠবেন, তখন একই অধিবেশনের সভাপতির আসনে থাকবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ২০২৬ সালের ২ জুন তিনি ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর এক বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের সরকারি নথি অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনোনয়ন ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। একদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে দেশের কথা বলবেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বসংস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বশীল মঞ্চটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের উপস্থিতি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের নেতৃত্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে আবেগময় জায়গাটি হয়তো অন্যত্র। একজন পিতা, একজন মা এবং তাঁদের সন্তান—তিনজনই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। জিয়াউর রহমান যখন জাতিসংঘে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশ তখন ছিল স্বাধীনতার পর কঠিন পুনর্গঠন ও উন্নয়ন-সংগ্রামের মধ্যে। খালেদা জিয়ার সময় বাংলাদেশ গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছিল। আর এখন তারেক রহমানের সামনে রয়েছে নতুন শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই ২০২৬ সালের এই সফরকে কেবল একটি প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বাদ পড়ে যায়। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা, একটি পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের নতুন প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।
জাতিসংঘের মঞ্চে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, কথা বলে একটি রাষ্ট্র। পরিচয় নয়, উপস্থাপিত হয় একটি দেশের স্বার্থ। আবেগ নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতে হয় বাস্তবতা, নীতি ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। জিয়াউর রহমানের সময়ের আত্মনির্ভরতার আহ্বান, খালেদা জিয়ার সময়ের গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের উচ্চারণ পেরিয়ে এবার তারেক রহমানের সামনে নতুন বাংলাদেশকে তুলে ধরার সুযোগ। একই পরিবারের তিনটি কণ্ঠ, তিনটি সময়। আর সেই সময়ের সেতুবন্ধন হয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও অবস্থান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ। গণতন্ত্র, অর্থনীতি, জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোও উঠে আসবে তাঁর বক্তব্যে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় নেতৃত্ব হিসেবে তাঁর এই উপস্থিতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে যোগ করবে নতুন এক অধ্যায়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
