রাজধানীতে থামছে না ছিনতাই গুলির ঘটনা

রাজধানীতে থামছে না ছিনতাই গুলির ঘটনা

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীতে একের পর এক গুলি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছে। কখনো চাঁদা না দেয়ায় বাসায় ঢুকে গুলি, কখনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, কখনো আবার অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা বা মূল্যবান জিনিস। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় অপরাধের ধরন ও বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও যেন অপরাধের মাত্রা কমছে না। যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুর বাগানের মুখে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনা তৈরি করে। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই প্রধান শিক্ষক চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। এর পরদিনই গত ৩০শে আগস্ট ধানমণ্ডিতে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ৩৮ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও মো. খোরশেদ আলম নামে এক ভুক্তভোগী বেকারি ব্যবসায়ী বলেন, ঘটনার দিন দুপুরে ধানমণ্ডি ১২ নম্বর সড়ক ধরে তিনি ৩৮ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন আট-দশ জন এসে অস্ত্র দেখিয়ে তার গতিরোধ করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ সময় খোরশেদের চিৎকারে আশেপাশের লোকজন ও পুলিশ এসে ধাওয়া করে মজিবুর রহমান ও তানভীর আবেদীনকে আটক করে। পরে তানভীরের শরীরে তল্লাশি চালিয়ে একটি রিভলবার ও চারটি গুলি পাওয়া যায়। আলোচিত ওই ঘটনায় ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। যারা একসময় র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন।

গতকাল দুপুরেও মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় এক নারীর রিকশা থামিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে তার ব্যাগ, মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সাসহ কানের দুল পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে- রাজধানীতে অন্তত ৩০০টির বেশি স্থানে নিয়মিত ছিনতাই হচ্ছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ৫০টি এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলনামূলক বেশি।

গতকাল বিকালে মোহাম্মদপুর এলাকার একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। পরে সেখানে তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

এদিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরের অদূরে বসিলা সেতুসংলগ্ন আরশীনগরে রায়ের বাজার এলাকার এলেক্স গ্রুপের সদস্য মো. ফরহাদ হোসেনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে তার প্রতিপক্ষরা। ভরা দুপুরে সকলের সামনে মেইন রাস্তায় ফেলে তাকে কুপিয়ে-গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় বর্তমানে রায়ের বাজার এলাকায় এলেক্স গ্রুপ ও পাটালি গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময়ে হতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এর আগেও ঠিক একইভাবে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমনকে সকলের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১২ই সেপ্টেম্বরও আদাবর-১০ এলাকার বালুর মাঠের কাছে খাল থেকে মাথা ও হাতসহ নারীর শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি পুরো এলাকায়।

একই দিন রাত ১০টার দিকে চাঁদার টাকা না দেয়ায় বাড্ডার হোসেন মার্কেটের পেছনে ময়নারবাগ বউবাজার এলাকায় বাসায় ঢুকে মোহাম্মদ রানা (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করা হয়েছে। পেশা গাড়িচালক ওই ভুক্তভোগী রানা বলেন, ‘আমার বড় ভাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে তামিম নামে স্থানীয় এক সন্ত্রাসী নিয়মিত চাঁদা দাবি করতো। আমি ভাইকে বলে দিই, তামিমকে আর কোনো চাঁদা দিতে হবে না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে আমার বাসায় ঢুকে গুলি করে। গত ৯ই সেপ্টেম্বরও রাজধানীর দক্ষিণখানে চাঁদা না দেয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মারধর ও গুলি করার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফইম উদ্দিন বলেন, ৪ঠা সেপ্টেম্বর দক্ষিণখান থানার মুক্তিযোদ্ধা রোডের আজমপুরে শাহিন (২৮) নামের এক ব্যক্তির পথরোধ করে কয়েকজন চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর ও হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে পালিয়ে যান তারা।

এই ঘটনায় মামলাও হয়েছে। দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে গত ৬ই সেপ্টেম্বরও যাত্রাবাড়ীতে একটি অটোরিকশা গ্যারেজে হামলার ঘটনায় ব্যবসায়ী সাগর খান ওরফে ইমরান (৩৮) নিহত হন। ৩রা সেপ্টেম্বর বনানীতে ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ওয়াকিটকি ও পুলিশ মনোগ্রামযুক্ত হাতকড়া উদ্ধার করা হয়। মতিঝিলেও চাঁদাবাজি ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। এর আগে চাপাতি, ছুরি, রামদা ও দেশীয় অস্ত্রসহ রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়াবাদ মসজিদ মার্কেট এলাকায় একটি দোকানে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় পল্লবী থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন দোকানের মালিক মো. মিলন (৪৮)। এ ছাড়াও সম্প্রতি এক আসামিকে গ্রেপ্তার করায় খোদ পল্লবী থানার ওসিকে ফোন করে হুমকি দেয় সন্ত্রাসী আশিক। যার ফোন কল রেকর্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন ঘটেই চলেছে রাজধানী জুড়ে।

এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র কমিশনার মোসলেহ্‌ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স রয়েছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে এসব সমস্যা নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। জনতার প্রতিরোধ কিন্তু সবচেয়ে বড় শক্তি। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে উদাহরণ রয়েছে। মাদক স্পট ও কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানার তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এসব তালিকা ধরে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রতিটি মাদক স্পট ও কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানায় অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স রয়েছে।