ডেঙ্গুর দাপট বারান্দা-সিঁড়িতে রোগীদের চিকিৎসা

ডেঙ্গুর দাপট বারান্দা-সিঁড়িতে রোগীদের চিকিৎসা

ফন্ট সাইজ:

একটি স্ট্যান্ডে ঝুলছে দুজনের স্যালাইন। কারও ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের বারান্দায়, কেউ শুয়ে আছেন করিডোরের মেঝেতে। কেউবা লিফটের সামনে সামান্য জায়গা পেয়ে সেখানেই কাতরাচ্ছেন জ্বরে। পাশে স্বজন- কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, কেউ মেঝেতে বসে সন্তানের মুখে তুলে দিচ্ছেন এক লোকমা ভাত। এ দৃশ্যটি রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। দেশে হু হু করে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে।

সরজমিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ভিড় সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩টি ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তাতেও রোগী সংকুলান হচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন বেড বাড়াতে হচ্ছে। অনেকে আবার বেড না পেয়ে ওয়ার্ডের বাইরে, বারান্দায়, সিঁড়ির সামনে ও পেছনে বেড স্থাপন করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীই এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ৫০২, ৪০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন ২৮ জন, ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৫ জন ও ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৫৫ জনের মতো রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ১৬৩ জনে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় একটি টুলের উপর বসে ছিলেন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জসিম হোসেন। ডেঙ্গু জ্বরে কাতর এই রোগীর ভাগ্যে জোটেনি একটি বেডও। বাধ্য হয়ে বারান্দায় বসেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে। একজনের স্যালাইন স্ট্যান্ড থেকে শেয়ার করে হাতে ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন নিচ্ছিলেন তিনি। পাশেই বসে তাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছিলেন মা। জসিম বলেন, গত তিনদিন ধরে আমি প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত। পাশাপাশি বমি ও শরীর ব্যথা অনেক। টেস্ট করার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর জ্বরে ঢামেকের ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে কাতরাচ্ছিলেন। পাশেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন বাবা আজগর আলী। মেয়ের কষ্টে অসহায় হয়ে পড়েছেন বাবা। তিনি বলেন, আমার মেয়েটার গত ৪ দিন ধরে জ্বর, বমি আর পাতলা পায়খানা। প্রাইভেটে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম আমরা। গরিব মানুষ, তাই ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এসেছি। এখন উপরওয়ালার কাছে একটাই প্রার্থনা- যেন মেয়েটা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে।

৪০২ নম্বর ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে হাসপাতালের লিফটের পাশে শুয়েছিলেন বংশালের বাসিন্দা রনি। গত ৩ দিন ধরে জ্বর, তার সঙ্গে বমি, শরীর ব্যথা। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ায় বাবা সেলিম তাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। তার বাবা বলেন, এখানে রুমে বেড পাইনি; তাই লিফটের পাশে একটা সিট ম্যানেজ করেছি। প্রচণ্ড গরম- ফ্যানও নেই। খুব কষ্ট পাচ্ছি।

মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে এখানে আসা মানেই ওই রোগীর জটিলতা বেশি। ডেঙ্গু জটিলতায় রক্তের জলীয় অংশ সরে যাচ্ছে এবং তা শরীরের অন্য কোথাও গিয়ে জমা হচ্ছে। এটা হতে পারে ত্বকের নিচে অথবা বুকের মধ্যে অথবা পায়ে গিয়ে জমা হচ্ছে অথবা অন্য কোথাও গিয়ে জমা হচ্ছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখছি জলীয় অংশ বের হচ্ছে কিনা এবং তা পূরণ করে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে ফ্লুইড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। রক্তের জলীয় অংশ রক্ত থেকে সরে গেলে রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, প্লাটিলেটও কমে কিন্তু তা নিয়ে আমরা তেমন কোনো চিন্তা করি না। কারণ, অন্যান্য জটিলতা দূর হয়ে গেলে প্লাটিলেটের পরিমাণও বেড়ে যায়। আমরা এখন রোগীর রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়লে শুধু প্লাটিলেট না সম্পূর্ণ রক্ত দেয়ার কথা চিন্তা করি। কারণ, সম্পূর্ণ রক্ত দিলে রোগীর অনেক বেশি কাজে আসে, প্লাটিলেটের সঙ্গে রক্তের অন্যান্যও অংশও রোগী পেয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, কিছু ডেঞ্জার সাইন (সতর্কতামূলক চিহ্ন) আছে সেগুলো রোগীর নজরে পড়লেই হাসপাতালে এসে ভর্তি হতে হবে। সেগুলো হলো- জ্বর অবস্থায় বিরতি ছাড়া পেটে ব্যথা হলে, পেট ফুলে গেলে, বমি হলে ও শ্বাসকষ্ট হলে।

ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৭ প্রাণহানি, হাসপাতালে সর্বোচ্চ ১৭৫৩ রোগী ভর্তি
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ১৭১ জনে দাঁড়ালো। গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৫৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে শুধু খুলনা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একজন করে ডেঙ্গুতে মোট ৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি (৩৯৪ জন) ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়াও উল্লিখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৩৪৯ জন ছাড়াও বরিশাল বিভাগে ১৮৬, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭৭, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৫, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭৪, রাজশাহী বিভাগে ১৫৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৩, রংপুর বিভাগে ৫৩ ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ডেঙ্গুতে ৩৬ জন মারা গেছেন। এর পরের মাস আগস্টে ৪৩ জন এবং চলতি সেপ্টেম্বরের ১৬ দিনেই ডেঙ্গুতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১লা জানুয়ারি থেকে ১৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ৮০ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লিখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৩২ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬, বরিশাল বিভাগে ১৩, রাজশাহী বিভাগে ৮, রংপুর বিভাগে ৩ এবং সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।