সমালোচনার মুখে বিতর্কিত কমিটি বাতিল, নতুন কমিটি গঠন

মমেক হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড

সমালোচনার মুখে বিতর্কিত কমিটি বাতিল, নতুন কমিটি গঠন

ফন্ট সাইজ:

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় আগের বিতর্কিত কমিটি বাতিল করে নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপা-তালের উপ-পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটে গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার সময় আগুনের সূত্রপাত ঘটে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের লক্ষ্যে ওই দিন মধ্যরাতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল যা বাতিল করে, নিম্নবর্ণিত চিকিৎসক/কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হলো।

হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের প্রধান ও অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে সভাপতি করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয়েছে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান। কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশনা দেয়া হয়। এ ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, হাপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ দক্ষিণ প্রকৌশলী সুব্রত রায়, হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. খন্দকার মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, আগের তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের দু’জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেয়া হবে। গত সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ও আতঙ্কিত হয়ে পদদলিত হওয়ার ঘটনায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যু এবং ২০ জন আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করেন। এ ঘটনার পর মঙ্গলবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাঈমা এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ভুয়া ভাউচার, অকেজো এআরডি সিস্টেম এবং অসাধু প্রকৌশলীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহার ও নিয়মিত তদারকি না করার কারণে লিফটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব অনিয়মে জড়িত দু’জন প্রকৌশলীকে নিয়ে হাসপাতালের আগুনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তাদের তদন্ত কমিটিতে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। স্থানীয় নাগরিক নেতা আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, যার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে লিফটের যন্ত্রাংশ অকেজো ছিল সেই প্রকৌশলীদেরই তদন্ত কমিটিতে রাখা মানে রক্ষককে ভক্ষকের দায়িত্ব দেয়া। এই কমিটি কখনোই নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেবে না; বরং নিজেদের অপরাধ ঢাকতেই ব্যস্ত থাকবে। আর প্রকৃত কারণ জনগণ জানতে পারবে না।

আতঙ্কে দু’জন ও স্বাভাবিকভাবে দু’জনের মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ মারা যায়নি, শুরুতে এমন দাবি করা হলেও এবার আগুনের আতঙ্কে দু’জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। তিনি দাবি করেছেন, বাকি দু’জন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পদদলিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি। বুধবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর কীভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের সব সমস্যা সমাধানে সময় দিতে হবে। তবে নিহতদের স্বজনদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ফুলবাড়িয়ার শাহজাহান মনির (৪৫), রমজান আলী (৩৮), তারাকান্দার কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং নেত্রকোণার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০) রয়েছেন বলে দাবি তাদের। স্বজনদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপদে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর রাত ১১টার দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় হতাহতের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সামনে আসে। মৃত্যুর সংখ্যা ও কারণ নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিভ্রান্তি নিরসনে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।