ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে বাংলাদেশের অন্যতম চিন্তার নাম কী! উত্তরে যে কেউ বলবেন— ‘ব্যাটিং’। উইকেটে সেট হয়ে ব্যাটারদের আউট হওয়া এদেশের ক্রিকেটে একটি রোগের মতোই। সঙ্গে ধারাবাহিকতার অভাব। এক ম্যাচে সেঞ্চুরি তো অন্য ম্যাচে শূন্য রানে আউট। এই সমস্যাগুলো সমাধানের পথ খুঁজছেন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। তার মতে গত ১০ মাসে তিন ফরম্যাটেই দারুণ করছেন ব্যাটাররা। এখন শুধু ধারাবাহিকভাবে পারফরম্যান্স প্রয়োজন। দৈনিক মানবজমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আশরাফুল তুলে ধরেছেন জাতীয় দলের ব্যাটিংয়ের সমস্যা ও সমাধানের কথা। তার কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো—
প্রশ্ন: জাতীয় দলের ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা আনতে কী ধরনের কাজ করছেন?
আশরাফুল: শেষ ১০ মাসে দল ৭টি টেস্ট, ১২টি ওয়ানডে ও ১১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে। এই সময়ে ব্যাটসম্যানরা প্রায় ১০-১২টি সেঞ্চুরি এবং ২০-২৫টি ফিফটি করেছে। ব্যাটসম্যানরা এখন ফিফটিকে বড় ইনিংসে রূপান্তর করতে নিজেদের খেলা প্রতিনিয়ত আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে।
প্রশ্ন: ব্যাটিং কোচ হিসেবে ব্যাটসম্যানদের এই পারফরম্যান্সে আপনি কতোটা সন্তুষ্ট?
আশরাফুল: আমি খুবই সন্তুষ্ট। শেষ ১০ মাসে সাত টেস্টের পাঁচটিতেই আমরা জয় পেয়েছি। এর মধ্যে নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহীম ও লিটন দাস দুটি করে সেঞ্চুরি করেছেন। তানজিদ তামিম ও মাহমুদুল হাসান জয় একটি করে সেঞ্চুরি পেয়েছেন। মুমিনুল হক টানা পাঁচ ইনিংসে ফিফটি করেছেন। ওয়ানডেতে তানজিদ চার ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি করেছে, যেখানে তার গড় প্রায় ৪৫। তৌহিদ হৃদয় শেষ ১২ ওয়ানডেতে প্রায় ৬১ গড়ে এবং টি-টোয়েন্টিতে ৪৫ গড়ে ১৪০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছে। সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যাটিং বিভাগ দারুণ ছন্দে আছে। দু-একটি ম্যাচে খারাপ হতেই পারে, সেটি খেলারই অংশ। শুধু ব্যাটিং নয়, বোলিং ও ফিল্ডিং মিলিয়ে পুরো দল চমৎকার খেলছে।
প্রশ্ন: দলের ব্যাটিংয়ে এখনো কোন জায়গাগুলোতে উন্নতির প্রয়োজন দেখছেন?
আশরাফুল: উন্নতির আসলে কোনো শেষ নেই। ভালো করার সুযোগ সব সময়ই থাকে। আমাদের মূল লক্ষ্য— ব্যাটসম্যানরা উইকেটে সেট হলে যেন ইনিংস বড় করতে পারে। প্রতিটি টেস্টেই আমরা অন্তত একটি করে বড় সেঞ্চুরি পাচ্ছি। শেষ সাত টেস্টের মধ্যে কেবল দুটি ম্যাচে আমরা ব্যর্থ হয়েছি— জিম্বাবুয়ে ও জ্যামাইকায়। বাউন্সি ও স্পঞ্জি বাউন্সের উইকেটের কারণে ওই দুটি টেস্টের চার ইনিংসে রান আসেনি। তবে পাকিস্তান, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাকি ছয় ইনিংসে ব্যাটসম্যানরা দুর্দান্ত ব্যাট করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনেও হয়তো একই ধরনের বাউন্স থাকবে, তাই ওই ধরনের উইকেটে কীভাবে সফল হওয়া যায়, তা নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি।
প্রশ্ন: সামনে আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ। ব্যস্ত সূচিতে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও বিশ্রামের বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
আশরাফুল: সামনে ব্যস্ত সূচি থাকায় আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। টেস্ট ম্যাচে বিশ্রামের বিষয়টি মূলত নির্বাচক, প্রধান কোচ ও অধিনায়কের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা সব সময় আলাদা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হোক বা না হোক, যেকোনো টেস্ট জয়ই দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। তাই ক্রিকেটাররা পুরোপুরি ফিট থাকলে সবারই নিয়মিত টেস্ট খেলা উচিত।
প্রশ্ন: দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে আপনার বোঝাপড়া ও আলোচনা কেমন হয়?
আশরাফুল: মুশফিকসহ দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারের সঙ্গেই ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। আলোচনাগুলো মূলত ম্যাচ পরিস্থিতি ও উইকেটের চরিত্র নিয়ে হয়— নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের বোলাররা কী পরিকল্পনা করতে পারে এবং কোন ধরনের শট খেলা নিরাপদ ও ফলপ্রসূ হবে। খেলোয়াড়রা যখন ভালো ছন্দে থাকে, তখন বাড়তি তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত না করে মানসিকভাবে স্বস্তিতে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: পেস বোলারদের ধারাবাহিক উন্নতির মূল কারণ কী?
আশরাফুল: আমাদের পেসাররা আগে থেকেই ভালো ছিল। বর্তমানে আট থেকে নয়জন ফাস্ট বোলার রয়েছে, যারা নিয়মিত ১৩৫ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে। তাসকিনের মতো অভিজ্ঞ বোলার রয়েছে, যে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। আবার নাহিদ রানার মতো বিশ্বমানের গতিসম্পন্ন পেসারও আছে। সামগ্রিকভাবে পেস আক্রমণ এখন খুবই ভারসাম্যপূর্ণ।
প্রশ্ন: জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে দেশি কোচদের সুযোগ এবং এই দায়িত্ব পালনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আশরাফুল: ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত আছি। এখন ফিল্ডিং কোচ আশিক ভাই ও বোলিং কোচ তালহা ভাই যুক্ত হয়েছেন। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে বয়সভিত্তিক, ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি। পরিচিত আবহে একাত্ম হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা চমৎকার এবং কোচিং স্টাফের সবাই এই দায়িত্ব দারুণ উপভোগ করছি।
