জাপানে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই নতুন চাপের মুখে পড়ছেন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। বিদেশিদের ভিসা, স্থায়ী বসবাস, নাগরিকত্ব, কর, সামাজিক বীমা, অবৈধ অবস্থান এবং জাপানি সমাজে একীভূত হওয়ার বিষয়ে সরকারের একের পর এক কঠোর উদ্যোগ ইতিমধ্যে জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তাকাইচি সরকারের বক্তব্য, এসব পদক্ষেপ বিদেশিবিরোধী নয়; বরং আইন মেনে চলা, অবৈধ অবস্থান বন্ধ করা এবং জাপানি সমাজে সুশৃঙ্খল সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এই কঠোরতার প্রভাব শুধু আইন ভঙ্গকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়ম মেনে বসবাসকারী বিদেশিদের ওপরও পড়তে পারে।
বিদেশি নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ওনোদা কিমি। ২০২৬ সালের ২৩শে জানুয়ারি সরকার বিদেশিদের গ্রহণ ও সুশৃঙ্খল সহাবস্থান নিয়ে সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ করে। পরবর্তীতে অবৈধ অবস্থান শূন্যে নামানো, নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর করা এবং বিদেশিদের গ্রহণের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়েও আলোচনা এগিয়েছে।
ভিসার অবস্থান পরিবর্তন ও নবায়নের ফি সর্বোচ্চ এক লাখ ইয়েন এবং স্থায়ী বসবাসের আবেদনের ফি সর্বোচ্চ তিন লাখ ইয়েন করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ফলে নিয়মিতভাবে ভিসা নবায়নকারী বিদেশি শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। আইন মেনে চলা, স্থিতিশীল জীবনযাপন এবং নিজের জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতার পাশাপাশি কর, পেনশন ও স্বাস্থ্যবীমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার বিষয়গুলো ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে। নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় জাপানে বসবাসের শর্ত কঠোর করার উদ্যোগ সামনে এসেছে।
অন্যদিকে জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫ জন- জাপানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৪৪ হাজার ৯৩৮ জন।
জনসংখ্যা কমে যাওয়া, প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংকটের কারণে বিদেশিরা এখন জাপানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন, খাদ্যসেবা ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি শ্রমিক ছাড়া স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নীতির বিপরীতে জাপানের ৪৭ প্রিফেকচারের গভর্নরদের সংগঠন বিদেশিদের শুধু শ্রমশক্তি হিসেবে নয়, স্থানীয় সমাজের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে বহু সাংস্কৃতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। অভিবাসন নীতি নিয়ে জাপানি ও বিদেশি নাগরিকদের প্রতিবাদও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু একইসঙ্গে নিয়ম মেনে বসবাসকারী লাখ লাখ বিদেশির অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। কারণ বিদেশিরা এখন জাপানে শুধু অস্থায়ী শ্রমিক নন; তারা কর দিচ্ছেন, ব্যবসা করছেন, কাজ করছেন, সন্তানদের বড় করছেন এবং স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে উঠছেন।
একদিকে সরকার বলছে বিদেশিদের জন্য শৃঙ্খলা জরুরি, অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন বলছে বিদেশিদের সমাজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন তাকাইচি সরকারের বড় পরীক্ষা।
বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যদি নিয়ম মেনে চলা বিদেশিরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন এবং একইসঙ্গে জাপানের শিল্প ও সমাজ শ্রমিক সংকটে পড়ে, তাহলে সেই নীতির রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হতে পারে।
[email protected]
