জন্মের পর একটি শিশু একটি স্থায়ী পরিচয় নম্বর পাবে। সেই পরিচয় ব্যবহার করেই সে টিকা নেবে, বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, চিকিৎসাসেবা পাবে, ব্যাংক হিসাব খুলবে, কর দেবে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করবে। সরকারি দপ্তরে গিয়ে তাকে বারবার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা পরিবারের তথ্য জমা দিতে হবে না। শুনতে নিঃসন্দেহে আধুনিক, নাগরিকবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী। বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি বা এক আইডির মূল ধারণাটি তাই স্বাগত জানানোর মতো।
কিন্তু ডিজিটাল পরিচয় কেবল একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুনভাবে নির্ধারণ করার একটি ব্যবস্থা। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, তথ্যের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় নজরদারি, বৈষম্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। ফলে এক আইডির সাফল্য কার্ডের নকশা কিংবা সফটওয়্যারের ক্ষমতার ওপর যতটা নির্ভর করবে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে আইন, জবাবদিহি, তথ্য সুরক্ষা এবং নাগরিকের আস্থার ওপর।
বাংলাদেশে এখন জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথি এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য আলাদা তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই নাগরিককে একই তথ্য একাধিকবার দিতে হয়। কোথাও নামের বানান এক রকম, অন্য কোথাও ভিন্ন। জন্মতারিখের অসামঞ্জস্য, একাধিক জন্মনিবন্ধন কিংবা ভিন্ন পরিচয়ে নথি তৈরির অভিযোগও নতুন নয়। এর ফলে নাগরিক যেমন ভোগান্তির শিকার হন, তেমনি ভুয়া সুবিধাভোগী, কর ফাঁকি, পরিচয় জালিয়াতি এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
এক আইডি এই বিশৃঙ্খলা কমাতে পারে। একজন নাগরিকের মৌলিক পরিচয় একবার যথাযথভাবে যাচাই হলে অনুমোদিত সরকারি দপ্তর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পরিচয় নিশ্চিত করতে পারবে। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো, শিক্ষার্থীর শিক্ষা ইতিহাস সংরক্ষণ, টিকা ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, করদাতা শনাক্ত করা এবং আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় এটি কার্যকর হতে পারে। নাগরিকের সময় ও যাতায়াত ব্যয় কমবে। সরকারি সেবার গতিও বাড়বে।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখায়, এমন ব্যবস্থা সফল হতে পারে। তবে শুধু একটি কার্ড চালু করলেই সাফল্য আসে না।
এস্তোনিয়ার প্রায় সব সরকারি সেবা এখন অনলাইনে পাওয়া যায়। দেশটির ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে নাগরিকেরা কর জমা দেওয়া, চিকিৎসার তথ্য দেখা, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং ভোট দেওয়ার মতো কাজ করতে পারেন। পরিচয় এক হলেও সব তথ্য একটি বিশাল কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে জমা করা হয়নি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ তথ্যের দায়িত্বে থাকে এবং নিরাপদ আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে। কোন কর্মকর্তা কখন নাগরিকের তথ্য দেখেছেন, নাগরিক সেটিও জানতে পারেন। এস্তোনিয়ায় ডিজিটাল পরিচয় তাই শুধু রাষ্ট্রের সুবিধার হাতিয়ার নয়, নাগরিকের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও।
সিঙ্গাপুরের সিংপাস সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দুই হাজার সাতশর বেশি সেবায় প্রবেশের সুযোগ দেয়। নাগরিককে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে একই তথ্য নতুন করে জমা দিতে হয় না। তবে কোন তথ্য কোন সেবাদাতা পাবে, তা নির্দিষ্ট অনুমতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। পাঁচ মিলিয়ন ব্যবহারকারী প্রতি মাসে চার কোটির বেশি লেনদেন করছেন এই ব্যবস্থায়।
যুক্তরাজ্যও গভর্নমেন্ট ওয়ান লগইন চালু করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে, নাগরিক যেন একই পরিচয় যাচাই করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবেশ করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য পুরোনো সব ব্যবস্থা এক দিনে বাতিল করেনি। ধাপে ধাপে সেবা যুক্ত করা হচ্ছে এবং এখনো সব সরকারি সেবা এই ব্যবস্থার আওতায় আসেনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল পরিচয় কাঠামো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সেখানে নাগরিককে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ না করার অধিকার দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু একজন ব্যক্তির বয়স আঠারোর বেশি কি না জানা প্রয়োজন হলে তার পূর্ণ জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা স্বাস্থ্যতথ্য জানার কথা নয়। একে বলা হয় তথ্যের ন্যূনতম ব্যবহার। ইউরোপীয় ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় নজরদারি ও নাগরিকের আচরণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ সীমিত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা এখানেই। এক পরিচয় মানেই সব তথ্য এক জায়গায় জমা রাখা নয়। পরিচয় নম্বর, পরিচয়পত্র এবং নাগরিকের সব ব্যক্তিগত তথ্যভাণ্ডার একই বিষয় নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাগরিকের রোগের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারে, শিক্ষা বিভাগ শিক্ষার তথ্য রাখতে পারে, নির্বাচন কমিশন ভোটারের তথ্য এবং রাজস্ব বিভাগ করের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান যেন অন্য প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য দেখতে না পারে। এক আইডি হতে পারে পরিচয় যাচাই ও তথ্যভাণ্ডারগুলোর নিরাপদ আন্তঃসংযোগের মাধ্যম। এটিকে নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্তসমৃদ্ধ একটি সর্বক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় পরিণত করা বিপজ্জনক হবে।
কারণ এমন একটি ভাণ্ডার অপরাধীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান লক্ষ্য হয়ে উঠবে। একবার নিরাপত্তা ভেঙে গেলে একজন নাগরিকের জন্মনিবন্ধন থেকে চিকিৎসা, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, সম্পদ এবং পরিবারের তথ্য পর্যন্ত প্রকাশিত হতে পারে। পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু আঙুলের ছাপ, মুখের গঠন কিংবা চোখের তথ্য পরিবর্তন করা যায় না। তাই জীবমাত্রিক তথ্য ফাঁস হলে ক্ষতি প্রায় স্থায়ী।
আরেকটি বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় নজরদারি। কোন নাগরিক কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, কী সুবিধা পাচ্ছেন, কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন কিংবা কী ধরনের আর্থিক লেনদেন করছেন, এসব তথ্য যদি একটি পরিচয়ের মাধ্যমে নির্বিচারে অনুসরণ করা যায়, তাহলে ডিজিটাল সেবা ধীরে ধীরে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে পরিণত হতে পারে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তথ্যভাণ্ডার থেকে যায়। ফলে ব্যবস্থাটি শুধু বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অপব্যবহার ঠেকাতে শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
বিশেষভাবে সংবেদনশীল হলো জন্মের পর শিশুকে স্থায়ী পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি। একটি শিশু নিজের সম্মতি দিতে পারে না। তার তথ্য কে সংগ্রহ করবে, কত দিন সংরক্ষণ করবে এবং কোন বয়সে সে নিজের তথ্য ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা আইনে পরিষ্কার করতে হবে। শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পারিবারিক অবস্থার তথ্য যেন ভবিষ্যতে চাকরি, বীমা, ঋণ কিংবা সামাজিক মূল্যায়নে তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, সে নিশ্চয়তাও জরুরি।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও প্রকাশ করা দরকার। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ ও তৈরিতে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ডে ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং এক আইডির জন্য আলাদা প্রকল্প হলে প্রশ্ন উঠবে, সরকার একই নাগরিকের তথ্য সংগ্রহে কতবার অর্থ ব্যয় করবে? এক আইডি যদি শেষ পর্যন্ত এসব কার্ডের সেবা ধারণ করে, তাহলে পৃথক কার্ড প্রকল্পগুলো এখনই পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। আগে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা নির্মাণ করে পরে সেগুলো একীভূত করার চেষ্টা করলে ব্যয় বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হবে।
তবে এক আইডির অর্থ এই নয় যে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা পেশাগত অনুমতিপত্রের আইনগত ভূমিকা পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে। পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক ভ্রমণের দলিল, ড্রাইভিং লাইসেন্স গাড়ি চালানোর যোগ্যতার প্রমাণ। এক পরিচয় নম্বর এসব নথির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তাদের পৃথক আইনগত উদ্দেশ্য থাকবে। ‘ফলে আর কোনো কার্ডের প্রয়োজন হবে না’ এমন ঘোষণা দেওয়ার আগে প্রযুক্তিগত ও আইনগত বাস্তবতা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
দেশের সব নাগরিকের কাছে স্মার্টফোন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট কিংবা ডিজিটাল দক্ষতা নেই। বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী নাগরিক, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। সার্ভার বন্ধ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মোবাইল হারিয়ে যাওয়া কিংবা আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে যেন কেউ চিকিৎসা, খাদ্যসহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত না হন। ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প যাচাই এবং সরাসরি সহায়তার সুযোগ রাখতে হবে।
প্রকল্পটি তাই জাতীয় পর্যায়ে চালুর আগে সীমিত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, তথ্য সুরক্ষার প্রভাব মূল্যায়ন এবং উন্মুক্ত কারিগরি মান গ্রহণ করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কী তথ্য চাইতে পারবে, কত দিন সংরক্ষণ করবে এবং নাগরিক কীভাবে ভুল সংশোধন বা অভিযোগ করতে পারবেন, তা আইনে নির্ধারণ করতে হবে। তথ্য দেখার প্রতিটি ঘটনার নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড রাখতে হবে এবং নাগরিককে নিজের তথ্য ব্যবহারের ইতিহাস জানার অধিকার দিতে হবে। তথ্য ফাঁস হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার বাস্তব দায়ও নিশ্চিত করতে হবে।
এক আইডি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পটির লক্ষ্য যদি শুধু আরেকটি কার্ড ছাপানো, নতুন তথ্যভাণ্ডার তৈরি কিংবা বড় অঙ্কের কেনাকাটা হয়, তাহলে এটি পুরোনো সমস্যার ডিজিটাল সংস্করণে পরিণত হবে। সফল এক আইডি সেই ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিক একবার পরিচয় দেবেন, রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বনিম্ন তথ্য ব্যবহার করবে এবং প্রতিটি ব্যবহার নাগরিকের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য থাকবে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু এক পরিচয় নয়, প্রয়োজন এক আস্থা। প্রযুক্তি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু সেই শক্তি যেন নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা না যায়। এক আইডির প্রকৃত পরীক্ষা তাই কার্ডটি কত আধুনিক হবে, সেটি নয়। পরীক্ষা হলো, এর ভেতরে নাগরিক কতটা নিরাপদ, স্বাধীন এবং সম্মানিত থাকবেন।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই-মেইল: [email protected]
