ছাদে সোলার, গ্রিডে বিদ্যুৎ—সরকার দেবে টাকা

ভিয়েতনামের শিক্ষা

ছাদে সোলার, গ্রিডে বিদ্যুৎ—সরকার দেবে টাকা

ফন্ট সাইজ:

সূর্যের আলো এবার শুধু আলো নয়, আয়েরও উৎস। সরকার দরজা খুলেছে; এখন দরকার সহজ ব্যবস্থা, মানুষের আস্থা ও বাস্তবায়নের সদিচ্ছা।

বাংলাদেশের প্রতিটি ছাদ যদি একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে ওঠে—কেমন হবে? ভাবনাটা আর কল্পনা নয়। সরকার এখন সেই সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজের ব্যবহারের পর জাতীয় গ্রিডে দেওয়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ব্যবস্থা স্থাপন করলে এ সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রণোদনা চলবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

নীতিগতভাবে এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্নটা হলো, ঘোষণাটি কতটা সহজে মানুষের ঘরে পৌঁছাবে এবং মানুষ কতটা সহজে এর সুবিধা নিতে পারবে? কারণ প্রজ্ঞাপন জারি করা সহজ। মানুষকে বিনিয়োগে নামানো কঠিন। এতদিন বিদ্যুৎ মানেই ছিল বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, বড় জমি, বড় বিনিয়োগ। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সেই ধারণা বদলে দিতে পারে।

আপনার বাড়ির ছাদ হতে পারে আপনার নিজের ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র। নিজের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যাবে গ্রিডে। তার হিসাব হবে, বিনিময়ে টাকা পাবেন। সরকারের হিসাবে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

অর্থাৎ বার্তাটি শুধু ‘দেশের জন্য সোলার বসান’ নয়। বরং—নিজের জন্য সোলার বসান, বিল কমান, বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিন, বিনিময়ে টাকা নিন। মানুষের বিনিয়োগের জন্য এটিই বাস্তব যুক্তি।

সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু নীতি ঘোষণা করেনি; নীতির সঙ্গে বাজারও তৈরি করেছে। সহজ সংযোগ, বিনিয়োগের সুযোগ ও আকর্ষণীয় ট্যারিফ সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশকেও একই শিক্ষা নিতে হবে।
মানুষকে পরিবেশের কথা বললে সে শুনবে। কিন্তু নিজের লাভের হিসাব দেখালে সে বিনিয়োগ করবে। তাই সোলারকে শুধু ‘সবুজ জ্বালানি’ হিসেবে প্রচার করলে হবে না। বলতে হবে, এটি বিদ্যুৎ বিল কমানোর ব্যবস্থা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং বাড়তি আয়ের পথ।

একজন মানুষ সোলার বসাতে চাইলে তার সামনে যেন একগুচ্ছ প্রশ্ন না দাঁড়ায় কোথা থেকে প্যানেল কিনবেন, কোন কোম্পানি নির্ভরযোগ্য, কত কিলোওয়াট লাগবে, খরচ কত, নেট মিটার পেতে কতদিন লাগবে, গ্রিডে কত ইউনিট দিলেন এবং টাকা কবে পাবেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার না হলে ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনাও যথেষ্ট হবে না।
বাংলাদেশে ভালো নীতির বড় শত্রু অনেক সময় নীতি নয়, জটিল প্রক্রিয়া।

নেট মিটার, অনুমোদন, কারিগরি পরীক্ষা, গ্রিড সংযোগ ও অর্থ পরিশোধ সবকিছু যতটা সম্ভব ডিজিটাল ও এক জানালার আওতায় আনতে হবে। একজন গ্রাহক যেন সোলার বসাতে গিয়ে অফিসের দরজায় দরজায় ঘুরে ক্লান্ত না হন। সরকার ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলেছে। এখন সেটিকে সত্যিকার অর্থেই ‘ওয়ান-স্টপ’ করতে হবে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অধিকাংশ মানুষ পড়বে না। জানলেও বুঝবে না। তাই দরকার ব্যাপক প্রচার। টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, ব্যাংক ও স্থানীয় প্রশাসনকে যুক্ত করে সহজ ভাষায় প্রচার চালাতে হবে।
মানুষকে বক্তৃতা নয়, হিসাব দিতে হবে। আপনার ছাদে এত কিলোওয়াট বসবে। আনুমানিক খরচ এত। নিজের ব্যবহারের পর এত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিতে পারবেন। এর বিপরীতে আপনি এই সুবিধা পাবেন। বিনিয়োগকারী আবেগ দিয়ে সোলার কেনেন না। তিনি হিসাব করে কেনেন।

মাথার ওপরই পড়ে আছে বিশাল সম্পদ! বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম সমস্যা জমি। বাংলাদেশে কৃষিজমি, বসতি ও শিল্পের জন্য জমির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। অথচ আমাদের মাথার ওপর বিপুল অব্যবহৃত জায়গা ছাদ।বাসাবাড়ি, কারখানা, গুদাম, অফিস, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসংখ্য ছাদে সোলার বসানো সম্ভব। এতে নতুন জমি অধিগ্রহণের দরকার নেই। কৃষিজমির ওপর চাপও পড়ে না। যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, তার কাছেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
এটি শুধু সৌরবিদ্যুৎ নয়; একটি বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎব্যবস্থারও সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা আমদানি নির্ভরতা। কয়লা, এলএনজি কিংবা অন্যান্য জ্বালানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে চাপ বাড়ে, ভূরাজনৈতিক সংকটে ঝুঁকিও বাড়ে। সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না। ডলার লাগে না, জাহাজ লাগে না, বন্দর লাগে না। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় জীবাশ্ম জ্বালানির মতো সরাসরি কার্বন নিঃসরণও হয় না।
অবশ্য সোলার একাই সব সমস্যার সমাধান নয়। রাতের উৎপাদন, ব্যাটারি, মেঘলা আবহাওয়া ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ থাকবে। বিপুলসংখ্যক ছাদ গ্রিডে যুক্ত হলে বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ আছে বলে সম্ভাবনাকে বাদ দেওয়ার কারণ নেই।

‘ঘরের ভূত’ যেন পথ আটকে না দাঁড়ায়! নবায়নযোগ্য জ্বালানি যত বাড়বে, প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে তার সংঘাতও বাড়তে পারে। কয়লা, এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানিকে ঘিরে বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয়েছে।
তাই সরকারকে নিজের ঘোষণার প্রতি সৎ থাকতে হবে। আজ প্রণোদনা দিয়ে কাল নিয়ম বদলে দিলে বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হবে। নিম্নমানের প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টার বাজারে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। গ্রাহকের পাওনা অর্থ সময়মতো দিতে হবে। গ্রিডে দেওয়া বিদ্যুতের হিসাব হতে হবে স্বচ্ছ। একজন মানুষ সোলার বসিয়ে যেন প্রথমেই না ভাবেন ‘ভুল করেছি।’

বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমাদের ছাদ আছে, সূর্যের আলো আছে, বিদ্যুতের চাহিদা আছে। দরকার শুধু একটি বিশ্বাসযোগ্য বাজার।
সরকার যদি সহজ নিয়ম, মানসম্মত সরবরাহ ব্যবস্থা, দ্রুত নেট মিটার সংযোগ এবং সময়মতো অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে পারে, মানুষকে খুব বেশি বোঝাতে হবে না। নিজের স্বার্থেই মানুষ ছাদে উঠবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রশ্ন। যে দেশ জ্বালানির জন্য যত বেশি পরনির্ভরশীল, বৈশ্বিক সংকটে তার ঝুঁকিও তত বেশি। তাই ছাদে সোলার বসানো কোনো ছোট কর্মসূচি নয়। এটি নির্ভরতা কমানোর একটি পথ।

সরকার দরজা খুলেছে। এখন দরকার দরজাটা সত্যিই খোলা রাখা। সূর্য প্রতিদিনই উঠবে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ সেই আলো শুধু দেখবে, নাকি আলোকে বিদ্যুতে পরিণত করে নিজের ভবিষ্যৎও তৈরি করবে?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]