৪৮ বছরে বিএনপি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্মাণের পরীক্ষায়

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

৪৮ বছরে বিএনপি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্মাণের পরীক্ষায়

ফন্ট সাইজ:

১লা সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তার প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করছে। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রমনা গ্রিনে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপরেখা সামনে আনেন।
বিএনপি’র জন্য ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীটি আগের সব প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে আলাদা। কারণ এবার বিএনপি শুধু একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের দল নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দলটি আবার বহু বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায়। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।

ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রকৃত প্রশ্ন ‘বিএনপি কতো বছর পার করলো’Ñএটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো: ৪৮ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বিএনপি এবার কেমন রাষ্ট্র নির্মাণ করবে? কারণ বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্রের দাবি করা এবং ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াÑদু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি’র অবস্থানকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। দলটির জন্ম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়, জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার কাঠামোর একটি বিশেষ পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠা হয়। দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়নমুখী রাজনীতি। বিভিন্ন সময়ে বিএনপি চারবার সরকার পরিচালনা করেছে এবং দুই দফা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসে দলটি যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তেমনি রাজনৈতিক সংকট, সামরিক হস্তক্ষেপ, নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, মামলা, কারাবরণ এবং দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির মধ্যদিয়েও গেছে। অতএব, বিএনপি’র ৪৮ বছরকে তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়-প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র-রাজনীতির পুনর্গঠন; ক্ষমতা ও দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং দীর্ঘ বিরোধী সংগ্রামের পর পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিএনপি’র দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূলধন তৈরি করেছে। বিশেষত ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা ও গ্রেপ্তার, আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলÑএসবই দলটির বর্তমান রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পটভূমি।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে বিএনপি নিজেই গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে।
যে দল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে, ক্ষমতায় এসে সেই গণতন্ত্রকে কীভাবে পরিচালনা করে-সেটিই তার প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে। কারণ, বিরোধী অবস্থানের গণতন্ত্র আর শাসনক্ষমতার গণতন্ত্র এক নয়।
বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহি চাইবে। কিন্তু সরকার হিসেবে বিরোধী দলের জবাবদিহি মেনে নিতে হবে। বিরোধীরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চাইবে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারকে সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যম সহ্য করতে হবে। বিরোধী দল প্রশাসনের নিরপেক্ষতা চাইবে। ক্ষমতায় বসে দলীয় স্বার্থের বাইরে প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা।

বর্তমান বিএনপি’র সামনে সেই পরীক্ষা অপেক্ষমাণ। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিএনপিকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ দিয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছেÑরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি কেবল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে, নাকি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে যাতে কোনো সরকারই অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে না পারে? এই প্রশ্ন থেকেই সাংবিধানিক সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কারের আলোচনা সামনে এসেছে।

জুলাই জাতীয় সনদে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তৈরি করে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় ছয়টি কমিশন কাজ করে এবং বিভিন্ন সুপারিশের মধ্য থেকে ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কাঠামো গড়ে ওঠে।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে; ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০.২৬ শতাংশ। এখানে বিএনপি’র সামনে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই সংস্কারকে দলীয় সুবিধার জন্য নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে বাস্তবায়ন করা। কারণ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সংসদে এই শক্তি সরকারকে দ্রুত আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেয়। কিন্তু এখানেই শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মৌলিক প্রশ্নটি আসে: সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার কি সবকিছু করতে পারে? উত্তরÑনা। এজন্য পারে না যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সীমাবদ্ধতার সমন্বয়। একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসবে, কিন্তু সেই ভোট তাকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেবে না। সংসদ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিষ্ঠান হলেও বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, বিরোধী দল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ক্ষমতা যখন দীর্ঘদিন এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। সুতরাং বিএনপি’র সামনে এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলোÑতারা কি নিজের ক্ষমতাকেও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ-এর মধ্যে রাখবে?
বিএনপিকে আরেকটি প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে। তা হলো, বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক ভুল ধারণা দীর্ঘদিন ধরে আছেÑশক্তিশালী সরকার মানেই শক্তিশালী রাষ্ট্র। এটা ঠিক যে, শক্তিশালী সরকার অনেক কিছু দ্রুত করতে পারে। কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্র এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে যা সরকার পরিবর্তনের পরও কার্যকর থাকে।

একটি প্রকৃত শক্তিশালী রাষ্ট্রে-নির্বাচন কমিশন সরকারনিরপেক্ষ; বিচার বিভাগ রাজনৈতিক নির্দেশনির্ভর নয়; পুলিশ পেশাদার; আমলাতন্ত্র দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না; দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান কার্যকর; সংসদ নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি করে; সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করতে পারে; নাগরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাইতে পারে।

বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিতÑদলটি কি শক্তিশালী সরকার তৈরি করবে, নাকি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে?
দ্বিতীয় পথটিই ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য সহায়ক বলে বিবেচিত হয়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি অদ্ভুত ধারণা আছেÑবিরোধী দল শক্তিশালী হলে সরকার দুর্বল হয়। বাস্তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর বিপরীতটি সত্য। কার্যকর বিরোধী দল সরকারকে আরও বৈধতা দেয়। কারণ বিরোধী দল সরকারের ভুল ধরবে, বিকল্প নীতি দেবে, সংসদীয় বিতর্ককে প্রাণবন্ত করবে এবং জনগণের একটি বিকল্প রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে কাজ করবে।
আজ বিএনপি সরকারে। ফলে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য তারা দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে, সেটির একটি অংশ হলো আইনানুগ বিরোধিতার অধিকার।
বিএনপি’র গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকার এখন নির্ধারিত হবে তারা বিরোধী দলের সঙ্গে কী আচরণ করে তার মাধ্যমে।

কারণ, সরকার ও বিরোধী দল মিলেই গণতন্ত্রের যাত্রাপথ তৈরি করে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও গণতন্ত্র থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ক্রমশ নেতৃত্বকেন্দ্রিক ও আমলাতান্ত্রিক হয়ে উঠে। বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের জন্যই এটি একটি চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি’র ক্ষেত্রেও প্রশ্ন আছেÑদলের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়? তৃণমূলের মতামত কতোটা প্রতিফলিত হয়? নেতৃত্বের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হয়? প্রার্থী মনোনয়ন কতোটা স্বচ্ছ? রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কি প্রাতিষ্ঠানিক, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক?
বিএনপি এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর সামনে এনে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের পাশাপাশি দলীয় পর্যায়ের গণতন্ত্রায়নও শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ গণতান্ত্রিক দল ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

৪৮ বছরে বিএনপি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের পথে চলেছে। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন ১৯ দফায় স্বনির্ভরতা, উৎপাদন, কৃষি, শিল্প, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর জোর ছিল। আজকের বাংলাদেশ সেই সময়ের বাংলাদেশ নয়। ১৯৭৮-এর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি আজ একটি বহুমুখী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, শিল্পায়ন, সেবা খাত, ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং নগরায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছে। তাই ১৯ দফার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়; বরং নতুন যুগের জন্য পুনর্ব্যাখ্যা করতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের শরীর থেকে অতীতের স্বৈরতান্ত্রিক কালোদাগ ও অধ্যায় মুছে দিতে পারবে। এক্ষেত্রে জরুরি কর্তব্য হলো জনআস্থা অর্জন করা।
একটি সরকারের অর্থনৈতিক সম্পদ কমে যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে পারে। বাজেট সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অদৃশ্য সম্পদ হলো public trust বা জনআস্থা। আস্থা নষ্ট হলে- কর আদায় কঠিন হয়, আইন মানার প্রবণতা কমে, বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়, রাজনৈতিক মেরূকরণ বাড়ে, এবং সরকারের বৈধতা দুর্বল হয়। বাংলাদেশের জন্য তাই বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূলধন শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়; জনগণের আস্থা। এই আস্থা অর্জিত হবে প্রশাসনের স্বচ্ছতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

বিএনপি’র ৪৮ বছর বা একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শেষ পর্যন্ত সেই দলেরই আয়না। কিন্তু বিএনপি এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব দলটির সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আজ বিএনপি আর কেবল বিরোধী দল নয়। দলটি সরকার পরিচালনাকারী। আর সরকার হিসেবে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; নিজের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা।
কারণ গণতন্ত্রে সর্বশক্তিমান সরকার বলে কিছু নেই। আছে সীমাবদ্ধ সরকার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং সার্বভৌম নাগরিক।

বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা চেয়েছিল; পরবর্তী পাঁচ দশকে তারা বারবার গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেছে। ২০২৪-এর অভিজ্ঞতা এবং ২০২৬-এর নির্বাচন সেই দীর্ঘ আকাক্সক্ষার নতুন অধ্যায়। জুলাই সনদের সংস্কার-আলোচনাতেও সমতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তি, আইনের শাসন, দুর্নীতি ও বৈষম্যহীনতা, গণতান্ত্রিক সুশাসন ইত্যাদিকে রাষ্ট্রের মৌলিক আকাক্সক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে জনইচ্ছা ও চাহিদার সমান্তরালে দল ও সরকারকে পরিচালিত করার সক্ষমতা ও দক্ষতার মধ্যে।
কারণ, বিএনপি’র ৪৮ বছর শুধু একটি দলের অতীতের হিসাব নয়। এটি এখন বাংলাদেশের পরবর্তী ৪৮ বছরের রাষ্ট্রচরিত্রের সম্ভাব্য নকশা নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ। দলটি ইতিহাসে কীভাবে স্মরণীয় হবে- তা তার অতীত যতটা নির্ধারণ করেছে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারণ করবে ক্ষমতায় থেকে সে কতোটা গণতন্ত্রকে নিজের জন্য নয়, সবার জন্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্মাণের পরীক্ষায় সফল হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ই হওয়া উচিত ৪৮ বছরের মাহেন্দ্রক্ষণে বিএনপি’র শাণিত শপথ।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।