বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি কেন প্রাসঙ্গিক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি কেন প্রাসঙ্গিক

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিক দল। বিএনপি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান খুঁটি এবং ডান ঘরানার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল ধারার রাজনৈতিক দল। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এর প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে দলটির উপস্থিতি অপরিহার্য প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের বিভিন্ন সংকটে এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনে বারবার একটি প্রধান পক্ষ হিসেবে সামনে এসেছে। মহান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির রাজনৈতিক পথচলা।

দলটির মূল রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, যা তৎকালীন আওয়ামী লীগের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে। আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ (যা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর জোর দেয়) এর বিপরীতে বিএনপি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ (যা ভৌগোলিক সীমানা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেয়) ধারণাটি জনপ্রিয় করে তোলে। এই দর্শনটি দেশের জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়, যা দলটিকে একটি স্থায়ী আদর্শিক ভিত্তি দিয়েছে।

প্রথম দিকে ডানপন্থী, বামপন্থী এবং ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন ঘরানার রাজনীতিকদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে দলটি দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মাতৃভূমির মুক্তির জন্য দিশাহীন জাতিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ১৯৭১ সালে উজ্জীবিত করেছিলেন। সাধারণ জনগণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক ও শ্রমিককে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেরণা ও উৎসাহ জুগিয়েছিলেন তিনি। দেশের ক্রান্তিকালে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর এই ক্ষণজন্মা মানুষটি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপের সামনে আসেন। রাষ্ট্রের হাল ধরার আগে যত অনাচার, অবিচার, গণতন্ত্র হরণ, হত্যা, কথা বলার স্বাধীনতা ও চলাচলের স্বাধীনতা যেভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল, তিনি ক্ষমতায় আসার পর সেসব পুনরায় চালু করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হয়, ভিন্ন মতাবলম্বী সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে এবং রাজনৈতিক দল করার অধিকার নিশ্চিত হয়। মানুষ ভয়ঙ্কর দুর্বিপাকের রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন: ১৯৮১ সালে সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর গণতন্ত্রের মা ও আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ বছর আপসহীন আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি আপসহীন ভাবমূর্তি তৈরি করে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর: ১৯৯১ সালে বিএনপির শাসনামলেই দেশের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটে। এই মেয়াদে মুক্তবাজার অর্থনীতি, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, নারীদের উপবৃত্তি চালুসহ কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও অন্যান্য সেবামূলক কাজ করার মতো নীতি গ্রহণ করা হয়। স্বৈরাচার এরশাদের ৯ বছরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার “আপসহীন” নেতৃত্বে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের আস্থা অর্জন করে।

সংকটের মুখে ধারাবাহিকতা: দীর্ঘ দেড় দশক (২০০৯-২০২৪) ক্ষমতার বাইরে থাকা, লাখ লাখ মামলা এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার পরেও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। চরম সংকটেও দলটির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা দলের প্রতি অনুগত থেকেছে, যা যেকোনো রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি।

দীর্ঘ মাঠের রাজনীতি ও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট: ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে দলটি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। দীর্ঘ দেড় দশক দলের প্রধান খালেদা জিয়ার মিথ্যে মামলায় কারাদণ্ড, গণতন্ত্রের বরপুত্র তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন এবং লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হামলা মামলার কারণে দলটি ব্যাপক চাপে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি পুনরায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে দৃশ্যপটে ফিরে আসে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘ সময় কারাবন্দী বা নির্বাসিত থাকার পরও দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর অবিকল্প রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে বিএনপি টিকে রয়েছে। একদলীয় শাসন ব্যবস্থার উত্থান ঠেকাতে এবং দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী শিবিরের অস্তিত্ব বজায় রাখতে বিএনপি সবসময় প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিবেশী ভারতের সাথে সুসম্পর্কের পাশাপাশি চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বভৌমত্ব-বান্ধব পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিএনপিকে একটি নির্ভরযোগ্য পক্ষ মনে করা হয় । দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দলটির ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে। বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের আদর্শের উপর ভর করে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের পথে দেশ পরিচালানার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের প্রধান তারেক রাহমান সেই লক্ষেই কাজ করে যাচ্ছেন। সবার সহযোগিতা পেলে তার হাত ধরেই গড়ে উঠবে প্রত্যাশিত সমৃদ্ধ দেশ।

লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়