বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে কেন এই বৈষম্য?

বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে কেন এই বৈষম্য?

ফন্ট সাইজ:

নতুন আমদানি নীতিমালায় পুরাতন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কেবল মাত্র নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে এই নীতিমালায়। এই নিষেধাজ্ঞা দেশে বিকাশমান বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। গ্রিন এনার্জির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন সারাবিশ্বে জনপ্রিয়। দেশেও বাড়ছে এর বাজার এবং ব্যবহার। কিন্তু নতুন জারি করা নীতিমালায় কেবলমাত্র নতুন গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখায় দেশে এ ধরনের গাড়ির প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুহূর্তে চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এইসব গাড়ি আমদানি করছে গুটি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানিকে সুবিধা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের গাড়ির বাজার এখনো জাপাননির্ভর। রিকন্ডিশন গাড়ির বেশির ভাগই আসে জাপান থেকে। রিকন্ডিশন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ থাকলে কম খরচে জাপান থেকেই গাড়ি আমদানি করা যাবে। এতে দেশে এই ধরনের গাড়ির ব্যবহার বাড়বে।

আমদানিকারক সূত্র বলছে, চীন থেকে আমদানি করা গাড়ির ক্ষেত্রে খুচরা যন্ত্রাংশ এখনো সহজলভ্য নয়। এমন এগুলোর মেরামতের ক্ষেত্রেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা নেই। জাপানি রিকন্ডিশন গাড়ির ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই।

আমদানিকারকরা বলছেন, পুরনো গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে উন্মুক্ত রাখা হলে ক্রেতারাই ঠিক করতে পারবেন তারা নতুন না পুরনো গাড়ি কিনবেন। চাহিদার ভিত্তিতে আমদানিকারকরা তাদের ব্যবসার ধরন নির্ধারণ করতে পারবেন। নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে। যার প্রভাব পড়বে দেশীয় বাজারে।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স এসোসিয়েশনের (বারভিডা) দীর্ঘ সময় সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ ডন মানবজমিনকে বলেন, আমদানি নীতিমালায় পুরাতন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এতে দেশের দেড় হাজার আমদানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ক্রেতারা নতুন না পুরাতন গাড়ি কিনবেন তা তারাই ঠিক করতে পারবেন। পুরাতন গাড়ি আমদানির সুযোগ থাকলে ক্রেতারা কম দামে এই গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। এর বাজারও বাড়বে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নতুন যে গাড়ি কিনতে এখন ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা লাগছে পুরাতন গাড়ির ক্ষেত্রে এই দাম অর্ধেক হবে। এতে গাড়ি বিক্রিও বেশি হবে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। বর্তমান সরকার তো ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার। আমরা আশা করবো সরকার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেবে এবং বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা থাকবে।

আমদানিকারক সূত্র জানায়, প্রায় ৫০ বছর ধরে যেসব গাড়ি ব্যবসায়ী জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে গাড়ি এনে বাংলাদেশের পরিবহন ও যানবাহন খাতকে সমৃদ্ধ করেছেন, দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন এবং দেশের আধুনিক ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে তৈরি করেছেন, সেই পুরোনো উদ্যোক্তারাই নতুন নীতিমালার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। কারণ এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার বিকাশমান। এই বাজারের বিকাশ হোক এটি সরকারও চাইছে। এমন অবস্থায় নতুন নীতিমালা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাপান থেকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর বিনিয়োগ করে একটি বড় বাজার তৈরি করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা, বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের অবদানকে উপেক্ষা করে হঠাৎ করে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি বন্ধ করে দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই নীতির ফলে কারা লাভবান হবে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? কার স্বার্থে এই নীতিমালা করা হয়েছে?
দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি আমদানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মরিয়ম কারস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. ইউনূস আলী মানবজমিনকে বলেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী ছিলেন, অনেকে পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু নতুন নীতিমালার কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হচ্ছে। সরকারি এই সিদ্ধান্তে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেকের ব্যবসা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারকে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স এসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আব্দুল হক মানবজমিনকে বলেন, পুরাতন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ না রাখাটা বৈষম্য। উন্নত অনেক দেশে এই সুযোগ রয়েছে। ডব্লিউটিও’র এ নিয়ে কোনো বাধা নেই। সরকার চাইলে ব্যাটারির আয়ুষ্কাল নিয়ে শর্ত দিয়ে দিতে পারে। পুরো নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কারণে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বারভিডা নেতাদের আলোচনা হয়েছে, স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। বারভিডা আশা করে সরকার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেবে।

উল্লেখ্য গত ২৪শে আগস্ট জারি করা আমদানি নীতিমালায় যানবাহন আমদানির ক্ষেত্রে বলা হয়, ৫ বছরের অধিক পুরাতন গাড়ি, মোটরকার, প্যাসেঞ্জার কার ও ট্রাক আমদানি করা যাইবে তবে পুরাতন বা ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি করা যাইবে না। বারবিড়া সূত্র জানায়, সরকারি এই নীতিমালা জারির আগে কিছু রিকন্ডিশন বৈদ্যুতিক গাড়ি জাহাজীকরণ হয়েছিল। এগুলো খালাসের সুযোগ থাকলেও এরপর থেকে আর এমন গাড়ি আমদানি করা যাবে না।
যদিও সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে করছাড়সহ বেশকিছু সুবিধা দিয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে এমন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন।
পরিবেশদূষণ রোধ ও জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক-কর এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক বাস-ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ছাড়া সব শুল্ক-কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। নতুন পিএইচইভি বা প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রেও কর কমিয়ে সুবিধা দেয়া হয়েছে।