প্রথম আলো
‘ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ-জুন—এই তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে ৩২ টাকা ৭৮ পয়সা এখন খেলাপি। এসব টাকা অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখছে না। আমানতকারীদের এই টাকা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন বেরিয়ে আসছে। আর এতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন,‘খেলাপি ঋণ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। চলমান সম্পদ মান পর্যালোচনার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আগে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আড়ালে ছিল।’
তিন মাসে বাড়ল ১৭ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। গত জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ একলাফে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়েছিল। এরপরের তিন মাসেও ঋণ খেলাপির সেই ধারা অব্যাহত থাকে। অক্টোবর-ডিসেম্বরে সামান্য কমলেও পরবর্তী দুই প্রান্তিকে (জানুয়ারি-জুন) কেবলই খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মূলত খেলাপি ঋণের ওপর নিয়মিত হারে সুদ যুক্ত হতে থাকায় এবং অনেক আগের অনাদায়ি ঋণ হিসাবভুক্ত হওয়ায় খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে খেলাপি কমাতে ইতিমধ্যে ঋণ পুনঃ তফসিলের নীতিগত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে খেলাপির হার কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যার সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করছেন ব্যাংকাররা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, খেলাপি ঋণের ওপর সুদ যুক্ত হয় না। খেলাপি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া লাখ কোটি টাকার ভুয়া ও বেনামি ঋণ।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকেই খেলাপি ৮০% বেশি
ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের। তীব্র তারল্য ও ঋণ সংকটে পড়ে এই ব্যাংকগুলো বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এই পাঁচটি ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে বিগত সময়ে অনিয়ম, জালিয়াতি, ভুয়া ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং বেনামি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে চারটিই ছিল চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম বা এস আলম গ্রুপের। এক্সিম ব্যাংকের মালিকানা ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
এর বাইরে সরকারি খাতের বেসিক, জনতা ও বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি।
কারা শীর্ষ ঋণ খেলাপি
গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ, কর্ণফুলী ফুডস ও মুরাদ এন্টারপ্রাইজ।
এ ছাড়া তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো), বেক্সিমকো কমিউনিকেশন (আকাশ ডিটিএইচ) রয়েছে। এই তালিকায় আরও রয়েছে কেয়া কসমেটিকস, যার মালিক আবদুল খালেক পাঠান। আরও আছে গোলাম মোস্তফার মালিকানাধীন দেশবন্ধু সুগার মিলস।
তালিকায় আরও রয়েছে সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট। এ ছাড়া আছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম (সিটিসেল), আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হকের মালিকানাধীন সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, ঢাকার রূপগঞ্জের রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।
যেভাবে প্রকাশ পেল খেলাপি ঋণ
২০০৯ সালের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ১৫ বছরের শাসনের পর সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে আর্থিক খাতের গোপন করা তথ্য ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র বের করে।
এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে তারল্যসংকট তৈরি হয়। এই অচলাবস্থা কাটাতে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল ও সুদ মওকুফ করে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতা আসার পর এই সুবিধা আরও বাড়ানো হয়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বারবার পুনঃ তফসিল করে সাময়িকভাবে কাগজ–কলমে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলেও ব্যাংক খাতের মৌলিক পরিবর্তন হবে না।
ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা চাপে পড়েছেন। নতুন ঋণ বিতরণ বেশ কমে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এ জন্য খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। সামনে খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘বিমানের কাউন্টারে টাকার খেলা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাতে বৈধ কাগজপত্র। ভিসা-টিকিটও ঠিকঠাক। তবুও বোর্ডিং পাশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের আটকে রাখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ‘সমস্যা সমাধান’-এর নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অতিরিক্ত ব্যাগেজের অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে ইকোনমি ক্লাসের টিকিট বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড-সবখানেই চলছে টাকার খেলা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের কর্মীদের একটি অসাধু চক্র এভাবেই গড়ে তুলেছে যাত্রী হয়রানি ও অর্থ লোপাটের বিশাল সিন্ডিকেট। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে এমন গুরুতর অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীদের এমন কার্যকলাপে যাত্রীরা যেমন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনোভাবেই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কোনো যাত্রীকে অযথা আটকে রেখে হয়রানি করা হলে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সিস্টেম লগ, ব্যাগেজ ট্যাগ, পেমেন্ট রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করতে হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের সেবা ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিমানের গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান লিটন যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা খোঁজ নিয়ে দেখছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে-যাত্রী হয়রানি রোধে জিরো টলারেন্স।
সূত্রমতে, বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের একজন কাউন্টার সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। তারা চেকইন ব্যাগেজের ওজনের হিসাবে কারচুপি করে অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং সেই অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও যাত্রীদের নানা ত্রুটি দেখিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে উৎকোচ নিয়ে বিজনেস ক্লাসে আসন বরাদ্দ এবং ‘লো-প্রোফাইল’ যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বোর্ডিং পাশ দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে। চক্রটির অন্য সদস্য হিসাবে গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার (জিএসএস) মো. জসিম উদ্দিন (জি-৫২১৯৫), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (জিএসএ) মোহাম্মাদ বুরহান উদ্দিন (জি-৫৩০৪৭) এবং জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের (জি-৫৩০৩০) নাম উঠে এসেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের যাত্রী মাহমুদ সারওয়ার চেকইনের জন্য জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের কাউন্টারে যান। তার সঙ্গে চারটি লাগেজ ছিল। এ সময় ব্যাগেজ এলাকায় কর্মরত হেলপার ইব্রাহিম ওই যাত্রীর সঙ্গে ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ চেকইনের চুক্তি করেন। পরে ইব্রাহিম জিএসএ মো. বুরহানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বুরহান ওই যাত্রীকে ফিরোজের লাইনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রাত ১২টা ৫১ মিনিটে ফিরোজ মাহমুদের নামে ২৩ ও ২২ কেজি ওজনের দুটি ব্যাগ চেকইন করেন। তবে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ যাত্রীর নিজের নামে ট্যাগ না করে অন্য একটি গ্রুপের চারজন যাত্রীর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। ওই চার যাত্রীর টিকিট নম্বর ছিল ৯৯৭২১০২২১৫৮৬১/২/৩/৪ এবং সিকোয়েন্স নম্বর ১৩৬ থেকে ১৩৯। তাদের চেকইন রাত ১১টা ১৮ মিনিটে সম্পন্ন করেন জিএসএ বুরহান। চার যাত্রীর জন্য মোট আটটি ব্যাগের সুবিধা থাকলেও তারা পাঁচটি ব্যাগ জমা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বুরহানের পরামর্শে ফিরোজ ওই গ্রুপের সঙ্গে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করেন। সিকোয়েন্স ১৩৭-এর যাত্রী রুমেনা/হুসনা জান্নাতের নামে দুটি ব্যাগের ট্যাগ ইস্যু করা হয়।
নিজের ক্লেইম ট্যাগে অন্য যাত্রীর নাম দেখতে পেয়ে মাহমুদ সারওয়ার চিৎকার শুরু করেন। এ সময় বিমানের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. নিয়াজ মোরশেদ ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। অতিরিক্ত দুটি ব্যাগের জন্য ৫২ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। বরং অন্য যাত্রীর নামে ব্যাগ বুকিং করা হয়েছে বলে জানান। এ সময় তিনি পেমেন্ট স্লিপ ও নিজের নামে ক্লেইম ট্যাগ দাবি করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হেলপার ইব্রাহিম তার পকেট থেকে ৫২ হাজার টাকা বের করে নানা টালবাহানা শুরু করেন। পরে নিরাপত্তা সুপারভাইজার তার পাশ জব্দ করেন।
এরপর যাত্রীর প্রোফাইলে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করা হয় এবং নতুন ট্যাগ ইস্যু করে সেগুলো বেল্টে ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যাগগুলো বে-১-এ পৌঁছালে লোডিং সুপারভাইজার আগের ট্যাগ খুলে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে দেন। নথি অনুযায়ী, নতুন ট্যাগ ইস্যুর প্রায় ১১ মিনিট পর রাত ১টা ৫৮ মিনিটে মিজানুর রহমান ফিরোজ আগের দুটি ট্যাগ সিস্টেম থেকে ডিলিট করেন। পরে হেলপার ইব্রাহিমের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা এবং যাত্রীর কাছ থেকে আরও আনুমানিক ১০ হাজার টাকা নেওয়ার পর পেমেন্ট স্লিপ ইস্যু করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় দীর্ঘ দেনদরবারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমা চাইলেও ওই কাউন্টার সুপারভাইজারের হস্তক্ষেপে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
কালের কণ্ঠ
‘আ. লীগের প্রকল্পে বড় কাটছাঁট’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া এবং ‘যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা’ নেই—এমন প্রকল্পগুলোতে কাটছাঁটের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় থাকা মোট দুই হাজার ৩৭২টি প্রকল্প যাচাই-বাছাই করে এর মধ্যে ৪৩৭টি প্রকল্পে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০৯টি প্রকল্প কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে ২৭০টি প্রকল্প চলতি অর্থবছরের মধ্যে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সেক্টরভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্লা ভূঁইয়া।
পরিকল্পনা কমিশনের এক সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্পই বাদ দেওয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া যে প্রকল্প থেকে জনগণ তেমন উপকৃত হবে না, তেমন প্রকল্পই বাদ দেওয়া হচ্ছে।
অনেক প্রকল্প প্রকল্প আছে যেগুলোর অনুমোদনের পর তেমন অগ্রগতি নেই, সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রকল্প আছে, যেগুলো রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও শেখ রেহানার নামে ৮২টি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৮টির বাস্তবায়ন শেষ হলেও প্রায় ৪০টি প্রকল্প এখনো চলমান।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত চলমান প্রকল্প এবং সবুজ পাতায় থাকা অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চলমান প্রকল্পগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প চিহ্নিত করা, প্রকল্পের ব্যয়ে অপচয়ের সুযোগ রয়েছে কি না—তা দেখা এবং প্রকল্পগুলো জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ১৮ জুন পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নির্দেশনা পাঠানো হয়। ১ আগস্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করে ৭ আগস্টের মধ্যে প্রকল্পগুলোর রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং সম্পন্ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়। এ কাজ যাচাইয়ের জন্য পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘লাখো আবেদন, তবু বিসিএসে উপযুক্ত প্রার্থী মিলছে না’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সর্বোচ্চ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএসে প্রতিবার কয়েক লাখ প্রার্থী আবেদন করেন। সাধারণ (জেনারেল) ক্যাডারে একেকটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করেন কয়েকশ প্রার্থী। তবু যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকছে।
টেকনিক্যাল বা পেশাগত ক্যাডারে এ সংকট আরও প্রকট। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বন, পরিসংখ্যান, তথ্য, কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ক্যাডারে প্রতি বছর শত শত পদ শূন্য রেখে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত যোগ্যতা, সাক্ষাৎকার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ সব ধাপ পেরিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলেও এই সংকট স্পষ্ট হয়েছে। এই বিসিএসে অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন পৌনে চার লাখ চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু বিভিন্ন ক্যাডারে চাহিদার তুলনায় সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কম। ফলে অনেক পদ শূন্য রাখতে হয়েছে।
পিএসসি-সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে অন্তত ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয় হয় রাষ্ট্রের। অথচ যোগ্য প্রার্থী খুঁজে না পাওয়ায় সরকারি ক্যাডার পদ শূন্য থেকে যাচ্ছে। এতে একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের ওপর চাপ আরও বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে অধিক সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
৪৭তম বিসিএসে নজিরবিহীন ঘটনা
বিসিএসের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে। গত ২৮ জুন এই ফল প্রকাশ করা হয়। এতে তিন হাজার ৪৮৭টি ক্যাডার পদের বিপরীতে পিএসসি সুপারিশ করেছে এক হাজার ৩২০ জনকে। দুই হাজার ১৬৭টি ক্যাডার পদ, অর্থাৎ প্রায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পদ শূন্য থেকে গেছে।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ক্যাডারের পাশাপাশি আরও ২০১ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ, প্রথম দফায় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ করা হয়েছে এক হাজার ৫২১ জনকে। অবশ্য সংশোধিত ফলে প্রাণিসম্পদ (লাইভস্টক) ক্যাডারে নতুন করে আরও ১৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
আগের বিসিএসগুলোর তুলনায় বড় ব্যবধান
গত কয়েকটি বিসিএসের চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ৪৭তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ইত্তেফাক
‘হাম-ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বিগ্ন শিশুর অভিভাবকরা’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশের চলমান হামের সংক্রমণ এবং এডিস মশার সংক্রমণে সৃষ্টি ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ছোট্ট শিশুর অভিভাবকরা দিন কাটাচ্ছেন উত্কণ্ঠা আর আতঙ্কে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে শুরু হওয়া অতি সংক্রমণ রোগ হাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যু যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। হামের রোগীর ঠাঁই দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় হাসপাতালের চিকিত্সকদের। অভিভাবকদের প্রত্যাশা ছিল, হামের টিকা পেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবেন তারা। কিন্তু সে আশা একরকম গুড়েবালিতে পরিণত হয়। হাম ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের সময় ছয় মাস অতিবাহিত হলেও এখনো হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ওপরে এবং মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন একাধিক।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলতে থাকা হামের সংক্রমণের মধ্যেই শুরু হয়েছে এডিস মশার সংক্রমণে সৃষ্টি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যু। শিশুরা সব সময় নাজুক অবস্থানে থাকে, ফলে শিশু থাকা পরিবারগুলোতে আতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। সে নিম্নবিত্ত পরিবারেই হোক বা উচ্চবিত্তের হোক। কখন পরিবারের ছোট্ট আদরের শিশুটি আক্রান্ত হবে হাম-ডেঙ্গুর মতো ভয়ংকর ব্যাধিতে।
কথা হয় সুরাইয়া ইসলামের সঙ্গে। তিনি একজন চাকরিজীবী মা। বলেন, ঘরে আমার ছোট্ট দুই বাচ্চা, এক জনার বয়স চার বছর দুই মাস, অন্যজনের ১৯ মাস। দুই বাচ্চাকে কতদিন যে বাইরের বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দেই না, খেলতে দেই না। আমার আত্মীয়ের বাচ্চারা বাসায় এলেও আমার ভয় লাগে। কারণ কোথায় থেকে হামের ভাইরাস আসবে, আর কখন এডিস মশা কামড়াবে, তা কে জানে! এই মা আরো জানান, যদি শুনি আশপাশে কোনো বাচ্চার জ্বর হয়েছে, তখনেই বুকটা ধরফর করতে শুরু করে। কি আর বলব, আমার চার বছরের পিয়াসকে সারাক্ষণ ফুল স্লিভের গেঞ্জি-প্যান্ট পরিয়ে রাখি। বাচ্চা ঘেমে যায়, তার পরেও খুলতে দেই না। যদি এডিস মশা কামড় দেয়। অন্য একজন অভিভাবক আয়শা বেগম। তিনি বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন। বলেন, ‘বস্তিতে দুই বাচ্চাকে রেখে আসি, কার সাথে খেলে, কার সাথে খায় কিছুই কইতে পারি না। হাম-ডেঙ্গু নিয়া ডর লাগে, কিন্তু কি করুম, কামে তো আইতেই হইব, না হলে প্যাটে ভাত জুটব ক্যামনে। আমাদের বস্তিতে অনেক বাচ্চার জ্বর হইছে, আমার বাচ্চারও জ্বর হইছে। আমার বাচ্চা হামের টিকা পায় নাই। এবার টিকা দিলে দিয়া নিব।’
এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১১০ জন। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে। একই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ২৮০ জনে। এ যাবত্ ডেঙ্গুর চিকিত্সা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৪৩৩ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২ হাজার ৭৪০ জন।
এদিকে হামের সংক্রমণে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরো ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরো ১ হাজার ৯৭ জন। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের এবং হামের উপসর্গে ৮৮৪ জনের। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার জনের মধ্যে তিন জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। অন্যজন ময়মনসিংহ বিভাগের।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘তিন সঙ্কটে চাপে জনজীবন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, মাঠে সারও নেই। এক দিকে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্পকারখানা বিপর্যস্ত, অন্য দিকে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে গুদামে পর্যাপ্ত মজুদের দাবি থাকলেও কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। জাতীয় সংসদে গতকাল বুধবার উঠে এসেছে দেশের জ্বালানি ও সার সঙ্কটের বিপরীতমুখী চিত্র। সরকারের হিসাবে গুদামে প্রায় ১৩ লাখ টন সার থাকলেও মাঠে কেন তার সঙ্কট- এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব মেলেনি। কৃষিমন্ত্রী সিন্ডিকেটের কথা জানিয়েছেন। আর বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কটের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ আখতার হোসেন সারের মাঠপর্যায়ের সঙ্কটের বিষয়টি তুলে ধরেন। জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই দাবি করেন। তিনি বলেন, একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করছে। এ সময় সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
আখতার হোসেন বলেন, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার মজুদের কথা বলা হলেও মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে অসাধু ডিলার ও সিন্ডিকেট সার নিয়ে কারসাজি করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৩৫০ টাকা দামের ইউরিয়া এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় এবং নির্ধারিত এক হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি একই দামে বা তারও বেশি দামে কৃষকদের কিনতে হচ্ছে। অতিরিক্ত দাম নেয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই রসিদ দেয়া হচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রংপুরের কাউনিয়া-পীরগাছাসহ কৃষিপ্রধান এলাকায় ভরা মৌসুমে কৃষকদের ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ন্যায্যমূল্যে সার না পাওয়ার কথা সংসদে তুলে ধরেন আখতার হোসেন। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কৃষক ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন এবং এর প্রভাব খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
গুদামে ১৩ লাখ টন, মাঠে সঙ্কট কেন?
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বর্তমানে সরকারি গুদামে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ রয়েছে। গত বছর একই সময়ে মজুদ ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। এর বাইরে প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন সার পথে রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে সারের সঙ্কট নেই। তবে একটি সংঘবদ্ধ দল কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করছে। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং আগামী দিনে আরো নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবে আখতার হোসেন প্রশ্ন রাখেন, গুদামে সার থাকার পরও কৃষক কেন সার পাচ্ছেন না? রংপুর, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান জেলায় মাঠে বাস্তব সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম থেকে কৃষকদের সার নিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি।
বণিক বার্তা
‘অনেক ছাড় দিয়েও খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিছাড়ের কারণে কেবল ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলের সুযোগসহ নানামুখী নীতিসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগ নিয়ে গত বছর রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলও হয়েছে। সে ধারা অব্যাহত রয়েছে চলতি বছরও। এর পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) হিসাবে এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ নিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। সে সময় ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় ওঠে। এরপর খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানামুখী নীতিসহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ করে হলেও এককালীন এক্সিট সুবিধা, বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছর মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের মতো নীতিসহায়তা। কিন্তু এসবের পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়া এখন অনেকটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এত নীতিছাড়ের পরও খেলাপিরা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না। আর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগের হদিসও মিলছে না। অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ায় সেগুলো আদায়ের পথও নেই। এমন পরিস্থিতিতে নীতিছাড় নয়, বরং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের কথা বলছেন তারা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদারতা খেলাপি ঋণের পরিস্থিতিকে এতটা খারাপ জায়গায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিষয়ে বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয়তা দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে দেখানো উদারতা সংকটের সমাধান করেনি। বরং সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। অপরাধ ও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগগুলো কাজে আসছে না।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর ‘তৈরি পোশাক খাত: অর্ডার কমছে, সুযোগ নিচ্ছে ভারত’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে দীর্ঘদিন ধরে কম খরচে পণ্য তৈরির সবচেয়ে ভরসার জায়গা ছিল বাংলাদেশ। তবে দেশের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের ধীরগতি এবং দীর্ঘ লিড টাইমের (পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা) মতো সংকটের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন কার্যাদেশের একটি অংশ এখন ভারতের কারখানায় সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের এই বিকল্প পথ খোঁজার প্রবণতা দেশের পোশাক খাতের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পোশাকশিল্প মালিক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে এখন শুধু কম দামে পণ্য তৈরিই শেষ কথা নয়, সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক খাতকে একই সঙ্গে একাধিক অভ্যন্তরীণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিপরীতে ভারত সরকারের দেওয়া বিশেষ প্রণোদনা, শক্তিশালী অবকাঠামো, নিজস্ব তুলার বড় উৎস এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ তাদের বাজার আরও মজবুত করছে।
পোশাকশিল্প মালিকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে লিড টাইম। দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন পণ্যের ক্ষেত্রে একটি মৌসুমের পোশাক বাজারে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ দেরি হলে পুরো বিপণন পরিকল্পনা ও বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন এমন দেশের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে অর্ডারের পর দ্রুত পণ্য তৈরি করে জাহাজে পাঠানো সম্ভব।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি অর্ডারের পণ্য জাহাজে তুলতে গড়ে ৬০-৯৫ দিন সময় লাগে, যেখানে ভারতে পণ্য তুলতে লাগে ৪৫-৬০ দিন। অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের মধ্যে ভিয়েতনামে লাগে ৬০ দিন এবং চীনে লাগে মাত্র ৩২ দিন। সময়ের এই বড় ব্যবধানই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ভারতসহ অন্য বিকল্প দেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিল্প মালিকেরা আরও বলছেন, শুধু শিপমেন্টে দীর্ঘসূত্রতাই একমাত্র কারণ নয়। ক্রেতার বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। চলমান জ্বালানিসংকট এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলোতে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদনেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম এবং কারখানা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনের খরচও অস্বাভাবিক বেড়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রায় ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০২৪ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে সব সময় এসব ঝুঁকিপূর্ণ সূচক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং সে অনুযায়ী ক্রয়াদেশে সিদ্ধান্ত নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য-সংক্রান্ত এমন কিছু পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কিছু কার্যাদেশ অন্য দেশে চলে গেছে, তার একটি অংশ ভারতেও গেছে। তবে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানিসংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিই এখন শিল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
তবে বিকেএমইএর নেতা এমনটা বললেও গতকাল সোমবার পোশাক খাতের সার্বিক অবস্থা জানাতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতিকে জানায়, গ্যাস-সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে প্রায় চার শ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জ্বালানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, ভারত দীর্ঘদিন ধরে পোশাকশিল্পে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করছে। তাঁর ভাষায়, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতা এবং ইউরোপের বাজারকে লক্ষ্য করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ ভারতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পোশাক তৈরি ও রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে ভারত নিজেদের সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করেছে। দেশটি প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) কর্মসূচির আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল ও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে হাজার হাজার কোটি রুপির প্রণোদনা দিচ্ছে। একই সঙ্গে পিএম মিত্র প্রকল্পের মাধ্যমে সুতা, কাপড়, রং, পোশাক তৈরি ও লজিস্টিক সুবিধা একই শিল্পাঞ্চলে এনে উৎপাদন সময় ও খরচ অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। তা ছাড়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তুলা উৎপাদক দেশ হওয়ায় ভারতের নিজস্ব কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাও বেশ শক্তিশালী। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রাখার কারণে ভবিষ্যতে ভারতীয় পোশাক আরও বাড়তি শুল্কসুবিধা পাওয়ার পথ তৈরি হতে যাচ্ছে। তবে এসব তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যা মূলত মূল উৎপাদন সক্ষমতায় নয়; সমস্যা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীলতা ও সময়সীমা নিশ্চিত করতে না পারায়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার স্বীকৃতি বাংলাদেশেই রয়েছে। এ দেশের দক্ষ শ্রমশক্তি ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত বন্দর সেবা, লিড টাইম কমিয়ে আনা এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই আধিপত্য ধরে রাখা কঠিন হবে। আজ যে কার্যাদেশের একটি অংশ ভারতমুখী হচ্ছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে তা আরও বড় ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, কারখানা ক্যাপাসিটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে কোম্পানির প্রতি বায়ারদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। সুতরাং সরকারের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিকল্পব্যবস্থা করতে হবে।
জানতে চাইলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো পরিচালক (নীতি পরিকল্পনা বিভাগ) আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে কিছু বায়ারের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে লিড টাইমে পণ্যপ্রাপ্তি নিয়ে। এ ছাড়াও এলডিসি-পরবর্তী ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পক্ষান্তরে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করেছে। ফলে স্থিতিশীলতার খাতিরে কিছু বায়ার চলে যাচ্ছে।
আবু মোখলেছ অবশ্য দাবি করেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করব, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, মার্কেটে তার প্রভাব পড়বে না।’
দেশ রূপান্তর
‘মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বেপরোয়া সিন্ডিকেট’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান উন্নত ও কম খরচে চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ থাকায় ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষার্থীদের এ চাহিদার সুযোগ নিয়ে দুই দেশে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে ভর্তির সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, সরকারি মেডিকেলে ভর্তিও নিয়ন্ত্রণ করে এই চক্র। সিন্ডিকেটের কারণে স্বাভাবিক খরচের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়।
এই সিন্ডিকেটে বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কর্তাব্যক্তি, মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু চক্র, ভারতীয় চিকিৎসক, ভারত ও বাংলাদেশের দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেসরকারি ৬৭ মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির আসন হচ্ছে ৬ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৫ শতাংশ হিসেবে আসন রয়েছে ২ হাজার ৭৬৪টি। এর মধ্যে এমবিবিএস কোর্সে ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এক হাজার ৭০০ বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তে এসেছেন।
সম্প্রতি ভারত থেকে পড়তে আসা এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। এই শিক্ষার্থী বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, ভারতে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করতে যে খরচ হয় বাংলাদেশে তা অর্ধেকের মধ্যে সম্ভব। এ জন্য তিনি অনলাইনে কলেজগুলোর খোঁজখবর নিয়ে এনাম মেডিকেল কলেজ ও আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুই কলেজ কর্র্তৃপক্ষই তাকে সরাসরি ভারতীয় এজেন্টের নম্বর দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তারা জানিয়ে দেন এজেন্ট ছাড়া সরাসরি ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ওই শিক্ষার্থীর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয় কলেজ দুটিতে। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের সেক্রেটারি (কলেজ সেক্রেটারি) মো. শাহিনুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় গোপন করে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক কথা বলেন। তিনি জানান, বিদেশি শিক্ষার্থী সরাসরি ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। ভারতের কাশ্মীরে ডেডি কনসালটেন্সির মো. নবাব, কলকাতায় মান্টু দেব এবং নেপালে ডা. সঞ্জিব ও তিলক পান্ডে তাদের এজেন্ট। ওই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে হলে তাদের মাধ্যমে আসতে হবে। এরপর তিনি তাদের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
একইভাবে আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ থেকে জানানো হয়, ভারতে এমসিএফ এডুকেশনের শেখ মান্নাফ এবং নেপালে সগীর খান তাদের এজেন্ট। এজেন্ট ছাড়া ভর্তির কোনো সুযোগ নেই।
কেবল এনাম কিংবা আনোয়ার খান মডার্ন নয়, দেশের প্রায় সব বেসরকারি মেডিকেল কলেজেই ভারত ও নেপালি শিক্ষার্থী ভর্তির দায়িত্ব বিদেশি এজেন্টদের হাতে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য দেশের বেসরকারি মেডিকেলগুলো বিদেশি এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। একেকজন শিক্ষার্থী ভর্তির বিনিময়ে ভারতীয় দালালদের কলেজভেদে ৫-৭ হাজার ডলার কমিশন দিয়ে থাকে। অন্যদিকে নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের থেকে এসব দালাল নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি ফি নিয়ে থাকেন। ফলে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের গুনতে হয় বাড়তি টাকা। এতে বিদেশি শিক্ষার্থী কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিদেশিদের অথরাইজেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে কলেজগুলো কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিও নেয়নি কোনো কলেজ। ফলে তারা সরকারকে কোনো টেক্স দেয় না। এতে রাজস্ব বঞ্চিত হয় দেশ। ব্যবসা করার জন্য তাদের কোনো লাইসেন্স নেই, নেওয়া হয়নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স এমনকি আর্থিক লেনদেন করার বিষয়টি জানানো হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংককেও। এতে এজেন্টরা নানা ছলছাতুরির আশ্রয় নেয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে যোগ্যতা নেই এমন শিক্ষার্থীদের নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে ভর্তি করিয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইচ্ছামতো ফি আদায় করছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। আবার এজেন্টরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করে অধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে । বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার আমেরিকান ডলার নিয়ে থাকে কলেজগুলো। কলেজের মান অনুযায়ী ফির পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এসব চক্র মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করত টেম্পারিং করা নকল নম্বরপত্র দিয়ে, যদিও বর্তমানে কড়াকড়ির কারণে এ প্রবণতা কমছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় এজেন্টরা শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে থাকে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ইকুইভেলেন্স সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়, যা তারা নিজেরাই বানিয়ে দিয়ে থাকে। একেকটি সার্টিফিকেটের জন্য তারা ১০-১৫ হাজার রুপি নিয়ে থাকেন বলে একাধিক ভারতীয় শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, কম নম্বর পাওয়ার কারণে বেসরকারি মেডিকেলে যোগ্যতা নেই এমন শিক্ষার্থীকে নম্বরপত্র নকল করে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয় এই চক্রটি। নকল নম্বরপত্র বানাতে তারা ৩-৫ লাখ রুপি পর্যন্ত নিয়ে থাকে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে, যারা ভারতে পরীক্ষা (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স এক্সাম) দিয়ে মেডিকেলে ভর্তির ন্যূনতম নম্বর তুলতে পারেননি বলে জানা গেছে।
সাধারণত সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হতে ভালো নম্বর থাকতে হয়। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়ার মতো নম্বর থাকে না, তাদের নকল নম্বরপত্র ভারত থেকে বানিয়ে দেয় এসব এজেন্ট। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরের ১৯ শিক্ষার্থী জাল সার্টিফিকেট নিয়ে সরকারি মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিল বলে দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছিল। শুধু তাই নয়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভারতীয় এজেন্ট জানান, যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী সার্ক কোটায় চান্স পেয়ে থাকেন, তাদের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওয়েবসাইটে দেওয়ার আগেই টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করে নেয় ভারতীয় এজেন্টরা। এরপর ওই শিক্ষার্থীদের চান্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১৮-২৫ লাখ রুপি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় তারা।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘বিএনপির ২২ লাখ নেতা-কর্মীর নামে এখনো ২৭ হাজার মামলা’। খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগ আমলে দায়ের হওয়া বিএনপির ২২ লাখ নেতা-কর্মীর ঘাড়ে এখনো ঝুলছে ২৭ হাজার মামলা। এসব মামলা নিষ্পত্তিতে সহায়তার জন্য পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে নেতা-কর্মীরা প্রায়ই তদবির করছেন। তারা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া দুঃখজনক। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চান তারা।
তবে বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলাসংক্রান্ত আবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে পাঠানো হলেও দায়িত্বশীলরা তা আমলে নিচ্ছেন না।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিভিন্নভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে দমনের কৌশল অবলম্বন করেছিল। সেই সরকার পাগলের মতো বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল। এমনকি পবিত্র হজ পালনের জন্য সৌদি আরব থাকাকালীনও কয়েকজনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা দিয়েছিল। তিনি বলেন, এসব মিথ্যা মামলা নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই বাকিসব মামলা নিষ্পত্তি হবে।
বিএনপির মামলা ও তথ্য সংরক্ষণ সমন্বয়ক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. সালাউদ্দিন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৬৫ লাখ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো ২৭ হাজার মামলা বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
এসব মামলায় দলের ২২ লাখ নেতা-কর্মী আসামি। তিনি জানান, মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নিচ্ছেন না। সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে এসব মিথ্যা মামলা শেষ করার জন্য আমাদের চাপ দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল সে সময় রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নামেও মামলার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। যেমন, হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামে ৪৫০টি, এস এম জাহাঙ্গীরের নামে ৩৫০টি, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর নামে ৩১৫টি, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামে ২৫০টি, মীর সরফত আলী সপুর নামে ২৫০টি, রফিকুল আলম মজনুর নামে ২২৬টি, আনিসুর রহমান তালুকদারের নামে ২১১টি, মামুন হাসানের নামে ২০০টি, রুহুল কবির রিজভীর নামে ১৮০টি, এস এম জিলানীর নামে ১৭০টি, শিমুল বিশ্বাসের নামে ১৭৪টি, রাজিব আহসানের নামে ১৪৬টি, আকরামুল হাসানের নামে ১৪৬টি, আবদুল কাদির ভূঁইয়ার নামে ১৫০টি, সালাহউদ্দিন আহমদের নামে ১৫০টি, তানভীর আহমেদ রবিনের নামে ১২৭টি, শহীদুল ইসলাম বাবুলের নামে ১১০টি, হাবিবুর রশীদের নামে ১০৩টি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ৯৮টি, বজলুল করিম চৌধুরীর নামে ৯৫টি, আবদুস সালামের নামে ৮০টি, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নামে ৫০টি এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নামে ৩৩টি মামলা ছিল। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও দীর্ঘদিন মামলার বাইরে ছিলেন না। দলীয় সূত্রে প্রকাশিত তথ্যে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত) দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দুটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই সরকারের তখনকার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল-এর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। জেলাপর্যায়ে মামলা পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নেতৃত্বে জেলা কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটিগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার তালিকা ও আবেদন আহ্বান করে। ভুক্তভোগীদের আবেদনগুলো পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি একাধিক সভা পরিচালনা করে। পরবর্তীতে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য চলতি বছরের ৫ মে জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এ কমিটি এখন পর্যন্ত কোনো সভা করতে পারেনি।
