ফ্রান্স ও জার্মানির দাবির প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় কমিশন। এর অংশ হিসেবে ইইউর কূটনৈতিক সেবা ভেঙে এর কিছু অংশ জোটটির নির্বাহী সংস্থা ইউরোপীয় কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে- বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) কোন কোন কার্যক্রম কমিশনের বিদ্যমান বিভাগগুলোর কাছে হস্তান্তর করা যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পর্যালোচনা শুরু করেছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে দুই দশকে ইইউর সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোর একটি আংশিকভাবে করা হবে।
ইইউর প্রধান কূটনীতিক কায়া কালাসের নেতৃত্বাধীন ইইএএস ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মতো সংকটগুলোতে কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হিমশিম খাচ্ছে বলে বিভিন্ন সদস্যদেশের রাজধানী থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
কমিশনের প্রধান কার্যালয় এবং আইন ও বাজেট বিভাগের কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এর লক্ষ্য হলো কাজের পুনরাবৃত্তি কমানো এবং বাণিজ্য, সহায়তা, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির ওপর কমিশনের ক্ষমতার সঙ্গে ইইউর কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও ভালোভাবে সমন্বয় করা। ইইউর পরবর্তী বহু বছর মেয়াদি বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় সদস্যদেশগুলোর সরকার ব্রাসেলসকে ব্যয় কমানোর চাপ দেয়ায় এই উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে সাশ্রয় নিশ্চিত করা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পুরো ইইএএস’কে এক বিশাল পররাষ্ট্রনীতি বিভাগ হিসেবে কমিশনের সঙ্গে একীভূত করা হবে না। বরং এর বিদ্যমান কার্যক্রমগুলো বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে, যাতে দক্ষতা বাড়ানো যায়।
পরিকল্পনার সমর্থকদের যুক্তি হলো, বছরে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো ব্যয়ের ইইএএসের বড় একটি অংশ কমিশনের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এলে ইইউর পররাষ্ট্রনীতি আরও সমন্বিত হবে, কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং বৈদেশিক নীতিসংক্রান্ত ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে। একই সময়ে সদস্যদেশগুলো ইইউর পরবর্তী যৌথ বাজেটের আকার ছোট করার জন্য চাপ দিচ্ছে। ইইউর কূটনীতিকরা বলছেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি বিস্তৃত কাঠামো ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হতে পারে। এটি ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সালের ইইউ বাজেট নিয়ে সমঝোতার অংশ হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এতে পরিবর্তন আসতে পারে। আগামী মাসে ইইউ নেতাদের একটি শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে পরিকল্পনাটি আরও বিস্তারিতভাবে তৈরি করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জোটের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি ফ্রান্স ও জার্মানি এই সম্মেলনকে সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য কাজে লাগাতে চায়। ফ্রান্স ও জার্মানি প্রস্তাব দিয়েছে, সংস্কার করা কাঠামোয় কায়া কালাসকে আরও শক্তিশালী ব্যক্তিগত ভূমিকা দেয়া হোক এবং কমিশনের সম্প্রসারিত বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কার্যক্রমের ওপর তার আরও বেশি নজরদারি থাকুক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইইএএসের একটি ছোট অংশ কমিশনের বাইরে স্বতন্ত্রভাবে থাকবে। এই অংশের দায়িত্বের মধ্যে ইইউর শান্তিরক্ষা মিশন ও সামরিক প্রশিক্ষণের মতো কার্যক্রম থাকতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইইউর বৈদেশিক কর্মকাণ্ড কীভাবে সংস্কার ও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা স্পষ্ট যে, আমাদের কাঠামো, উপকরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলো যাতে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আমাদের নিয়মিতভাবে আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই আলোচনায় অবদান রাখতে কমিশন প্রস্তুত। ইইউর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কায়া কালাস ইইউর বৈদেশিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
তিনি আরও বলেন, ইইএএসের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত সদস্যদেশগুলোর অনুমোদন নিয়েই নিতে হবে। ইইএএসের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে কায়া কালাস প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। গ্রীষ্মকালজুড়েই ফ্রান্স ও জার্মানির এই উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে। প্রথমে একটি গোপনীয় ফরাসি নথিতে ইইউর পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো পুনর্গঠনের বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা হয়। এরপর জুলাইয়ে একটি যৌথ ঘোষণায় ইইউজুড়ে এ বিষয়ে বৃহত্তর আলোচনার আহ্বান জানানো হয়। এ সপ্তাহে ফ্রান্স ও জার্মানির একটি যৌথ নথিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে ইইএএসের বেশিরভাগ সেবা কমিশনের কাঠামোর মধ্যে একীভূত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
