পে-স্কেল অনুমোদন

ফন্ট সাইজ:

সরকারি কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেল (পে-স্কেল)-২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। ভাতা কার্যকর ২০২৮ এর জানুয়ারিতে। পেনশন বাড়বে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ। নতুন বেতন স্কেল চলতি বছরের ১লা জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এতে জানানো হয়, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। উক্ত বেতন স্কেলের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে যা ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখ হতে কার্যকর হবে। জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫ এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সেগুলোর ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করেছিল। সচিব কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।

নতুন বেতন কাঠামোর সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এর আওতায় ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে ১লা জুলাই ২০২৭ এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভাতাসমূহ ১লা জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে।

মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে: জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।

ন্যায্যতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। ফলে, সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১লা জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১লা জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অন্যতম কারণ একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।

কম পেনশন যাদের, বাড়বে তাদের বেশি: নতুন বেতন কাঠামোয় পুরনো পেনশনারদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র‌্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশন বাড়ানোর নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ। ফলে যেসকল পেনশনভোগী দীর্ঘদিন পূর্বে অবসরে গমন করেছেন এবং যারা তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা: নতুন বেতন স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সবার জন্য মোবাইল ভাতা: নতুন বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম- সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এতদিন ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।

এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি যার সংস্থান গবফরঁস ঞবৎস ইঁফমবঃ ঋৎধসবড়িৎশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরসমূহের বাজেটে রাখা হয়েছে। সরকার মনে করে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে যেখানে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান বর্ণিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতন স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হবে।