ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুদের ৬৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক লেনদেন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুদ দ্বিগুণেরও বেশি হবে, দেশটির তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং সব মার্কিন নাগরিকের জন্য জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, এই চুক্তি ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের দেশ ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি আগে থেকেই দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। এ বছর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর তিনি এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হন। এর মধ্যে ইরান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে চাপের মুখেও পড়েছেন ট্রাম্প।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে মার্কিন ও ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য বিশাল জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য এই চুক্তি প্রায় ১০,০০০ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আসবে, উচ্চ বেতনের হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠনে গতি আনবে। অন্যদিকে ট্রাম্প তার পোস্টে জানিয়েছেন, রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বেসরকারি ব্যবসার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের সঙ্গে এই চুক্তিতে পৌঁছেছেন। তবে ওই অংশীদারত্বের ধরন, চুক্তির শর্ত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি ট্রাম্প। তার দাবি, মার্কিন করদাতাদের কোনো খরচ ছাড়াই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, চুক্তিটি তার দেশের ‘পুনরুজ্জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব’ ফেলবে। তিনি জানান, চুক্তির আওতায় ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়ন করা হবে। এসব তেলক্ষেত্রে প্রমাণিতভাবে ৬৫০০ কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি এতে ১০,০০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের জন্য ২০,৯০০ কোটি ডলারের বেশি কর আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে। রদ্রিগেজ বলেন, এসব বিনিয়োগ শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নেই সহায়তা করবে না; দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলায় অভিজ্ঞ একটি বেসরকারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে থাকবে। ওই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, রদ্রিগেজ ওই যৌথ উদ্যোগকে তেলক্ষেত্র পরিচালনার জন্য ১০০ বছরের অনুমতিও দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প এই অস্বাভাবিক চুক্তির বিষয়ে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেননি। চুক্তিটি কার্যত একটি বিদেশি দেশের সার্বভৌম জাতীয় সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এমনকি ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকের তেল রাজস্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটির নিয়ন্ত্রণের চেয়েও ভেনেজুয়েলার এই চুক্তির পরিধি বিস্তৃত বলে মনে হচ্ছে। তবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে চুক্তিটি আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত পাঠও প্রকাশ করা হয়নি।
চলতি বছরের ৩রা জানুয়ারি ট্রাম্পের অনুমোদনে পরিচালিত মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প বলেন, ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর’ না হওয়া পর্যন্ত তার প্রশাসন ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল দেশটির তেল বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদ রয়েছে। আনুমানিক ৩০,৩০০ কোটি ব্যারেল এর পরিমাণ। তবে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুদ্ধারে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে অন্তত ১০,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।
এর আগে তিনি ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার দাবি করে অভিযোগ করেন, দেশটি অতীতে ‘একতরফাভাবে আমেরিকান তেল, আমেরিকান সম্পদ ও আমেরিকান প্ল্যাটফর্ম দখল করে বিক্রি করেছে। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার’ ক্ষতি হয়েছে।
