মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এই পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কানাডাভিত্তিক ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। অর্থনীতির মোট আকারে তখন মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ডেনমার্ক ও হংকংয়ের মতো অর্থনীতিকেও পেছনে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো। যে দেশটি স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই দেশ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রথম সারির চল্লিশটি দেশের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই পূর্বাভাসকে কেবল জাতীয় সাফল্যের উৎসব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বাংলাদেশের সামনে আরও বড় দায়িত্ব, কঠিন সংস্কার এবং বিচক্ষণ অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি জিডিপির পূর্বাভাস। অর্থাৎ এটি বর্তমান বাজারমূল্য ও মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিনিময় হারের ওপর নির্ভরশীল। মূল্যস্ফীতি বাড়লে অর্থনীতির নামমাত্র আকারও বাড়তে পারে। আবার টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হলে স্থানীয় মুদ্রায় উৎপাদন বাড়লেও ডলারে জিডিপির হিসাব প্রত্যাশার নিচে নেমে যেতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস কোনো নিশ্চিত ফল নয়; এটি নির্দিষ্ট নীতি, প্রবৃদ্ধি, বিনিময় হার ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি একটি সম্ভাব্য চিত্র। বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নামমাত্র জিডিপি প্রায় ৫১১ বিলিয়ন ডলার হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একটি দেশের মোট অর্থনীতির আকার বড় হওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়া এক কথা নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা মালয়েশিয়া বা ডেনমার্কের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে মোট জিডিপিতে তাদের ছাড়িয়ে গেলেও মাথাপিছু আয়, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মান, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নাগরিক সুবিধার দিক থেকে ব্যবধান থেকে যেতে পারে। একটি বৃহৎ জনসংখ্যার সম্মিলিত উৎপাদন বাংলাদেশকে বড় অর্থনীতি বানাতে পারে; কিন্তু সেই উৎপাদনের সুফল ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত না হলে দেশটি ধনী হওয়ার আগেই কেবল বৈষম্যপূর্ণ এক বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের সামনে আসল পরীক্ষা তাই অর্থনীতির আকার বাড়ানো নয়, অর্থনীতির গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা। এখনো দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলেও একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তৈরি পোশাক খাতকেও কম দামের বিপুল উৎপাদন থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য, নিজস্ব নকশা, ব্র্যান্ডিং এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে যেতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর নতুন চ্যালেঞ্জও আসবে। বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে রপ্তানিকারকদের কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার ধরে রাখতে শ্রম অধিকার, পরিবেশ, সুশাসন ও উৎপাদনের উৎস শনাক্ত করার মতো শর্ত পূরণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সুবিধা বাড়াতে বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কেরও গুরুত্ব থাকবে। ফলে বাণিজ্যনীতি আর শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি, শ্রমনীতি, জলবায়ু কৌশল এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উত্থানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানির প্রায় সমান অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। পাকিস্তান বড় জনসংখ্যা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঋণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়ছে। শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। নেপাল ও ভুটান আকারে ছোট হলেও জলবিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করার বিরল ভূকৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।
অথচ দক্ষিণ এশিয়া এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চলগুলোর একটি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ব্যয় বেশি, রেল ও সড়ক যোগাযোগ অপর্যাপ্ত এবং রাজনৈতিক সন্দেহ অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে শুধু জাতীয় বাজার নয়, একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ট্রানজিট ফি এবং নতুন বাজারের সুবিধা পেতে পারে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে স্থলসংযোগের প্রবেশদ্বারও হয়ে উঠতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আবেগ, দলীয় আনুগত্য কিংবা একটি বিশেষ সরকারের সমীকরণের বাইরে নিতে হবে। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অশুল্ক বাধার মতো সমস্যার ন্যায্য সমাধান ছাড়া কৌশলগত অংশীদারত্ব জনসমর্থন পাবে না। একইভাবে বাংলাদেশেরও সংযোগ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা এবং জনগণের সম্মতি।
চীন বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো অংশীদার এবং পণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস। জাপান মানসম্পন্ন অবকাঠামো, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্সের প্রধান ভিত্তি। ফলে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একটি শক্তির দিকে একচেটিয়াভাবে ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয় এমন কৌশলগত কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ, ভারতের সঙ্গে সংযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জাপানের সঙ্গে শিল্পায়ন এবং ইউরোপের সঙ্গে সবুজ রূপান্তর ও মানসম্মত রপ্তানি সম্পর্ক গভীর করা যেতে পারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ককে শ্রমবাজারের বাইরে নিয়ে বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা শিল্প, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত সবার সঙ্গে কাজ করা, কিন্তু কারও ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের অন্ধ অনুসারী না হওয়া।
বিশ্ব অর্থনীতি ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু এই সম্প্রসারণ হবে প্রতিযোগিতামুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি ও বাণিজ্য দ্বন্দ্ব, ইউরোপের নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাস, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন, জলবায়ু দুর্যোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দেবে। সস্তা শ্রমের সুবিধা বাংলাদেশের জন্য আর অনির্দিষ্টকাল থাকবে না। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এমন অনেক কাজ কমিয়ে দিতে পারে, যার ওপর বর্তমান শিল্পায়ন দাঁড়িয়ে আছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় এখনই বড় পরিবর্তন না আনলে ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়তে পারে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, রাজস্ব আদায়ের স্বল্পতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতাও বড় বাধা। একটি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি দুর্বল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অস্বচ্ছ পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়াতে পারে না। বিনিয়োগকারীরা শুধু বড় বাজার দেখেন না; তারা আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তাও দেখেন। অর্থনৈতিক কূটনীতি সফল করতে হলে ঘরের ভেতর বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করাই প্রথম শর্ত।
বাংলাদেশের উত্থানকে শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান হতে হবে। একজন তরুণ যদি যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পান, একজন কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, মধ্যবিত্ত পরিবার মূল্যস্ফীতিতে সঞ্চয় হারায় কিংবা দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার ব্যয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্ব র্যাঙ্কিং তাদের কাছে অর্থহীন। জিডিপির পাশে তাই কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশের সূচকও সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা দরকার।
৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনার জানালা দেখিয়েছে। কিন্তু জানালার ওপারে পৌঁছানোর সেতু এখনো নির্মিত হয়নি। সেই সেতুর স্তম্ভ হবে সুশাসন, দক্ষ মানবসম্পদ, বহুমুখী রপ্তানি, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংযোগ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলগত কূটনীতি। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহৎ অর্থনীতি হবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাংলাদেশ কি একই সময়ে নাগরিকের মর্যাদা, সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারবে? বড় অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই-মেইল: [email protected]
