প্রকৃতির তাণ্ডব কতখানি নির্দয়, হিংস্র ও অকস্মাৎ হতে পারে— নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রলয় রূপালী পর্দার যেকোনো কল্পবিজ্ঞান বা হরর মুভিকেও হার মানিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে হাসিখুশি লোকালয়, ব্যস্ত হাটবাজার, আধুনিক পরিকাঠামো এবং সহস্রাব্দের ঐতিহ্যকে গিলে খেল এক নিদারুণ কাদার তোড়। কোনো পূর্বসতর্কতা ছিল না, ছিল না কোনো সাইক্লোন শেল্টারে পালিয়ে যাওয়ার মতো ফুরসত। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আছড়ে পড়া সেই ১০০ মিটার উঁচু বরফ-কাদা-পানির দানবীয় ঢেউ কেড়ে নিয়েছে শত শত তাজা প্রাণ, নিমিষে উধাও করে দিয়েছে হাজারেরও বেশি মানুষকে। চোখের পলকে সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার এই বিভীষিকা কেবল নেপালের এক ভৌগোলিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং মানবজাতির জন্য জলবায়ু সংকটের এক জলজ্যান্ত সতর্ক সংকেত।
নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারের সেই কাপড়ের ব্যবসায়ীর হৃদয়বিদারক বর্ণনার কথা ভাবা যাক। চারপাশে কোনো বৃষ্টি ছিল না। নীল আকাশের নিচে সবাই যখন নিজ নিজ দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো প্রশাসনের এক চিলতে অস্পষ্ট সতর্কবার্তা—‘তিব্বত সীমান্তে নদী আটকে গেছে, উঁচুতে উঠুন!’ কিন্তু সতর্কবার্তাটি অনুধাবন করে এক পা ফেলার আগেই বিশাল এক পলির প্রাচীর আছড়ে পড়ল। চোখের সামনে ধেয়ে আসা নদীর গর্ভে ভেসে গেলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ও তরুণ সন্তান। বাঁচার জন্য অনেকে উঁচু স্থানে দৌড় দিলেও জলোচ্ছ্বাসের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে তাদের চাপা দিয়ে চলে যায়।
এই দৃশ্য কোনো সেলুলয়েডে ধারণ করা কাল্পনিক হরর মুভির চিত্রনাট্য নয়; এটি নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং জেলার নির্মম বাস্তব। রাসুয়া জেলার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো পানি ধেয়ে আসতে দেখেছেন তিনি, যা মুহূর্তের মধ্যে আস্ত একটি বাজার ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল যে, শক্তিশালী কোনো ভূকম্পনের ফলেই হয়তো এই বিপর্যয়ের উৎপত্তি। কিন্তু মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের যৌথ সিসমিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনাটি ভূকম্পনজাত নয়। পাহাড়ের চূড়া থেকে বিশাল আকৃতির বরফখণ্ড (Glacier Ice) এবং শিলাখণ্ড ধসে পড়ে এক ভয়াবহ ভূ-ধসের (Landslide) সৃষ্টি করে।
এই বিশাল ধস ভোতেকোশি ও তার উপনদী লেন্দে খোলার স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে এক বিশাল অস্থায়ী জলাধার বা ‘জলবোমা’ তৈরি করে। আধা ঘণ্টার মধ্যে নদী অববাহিকায় আটকে থাকা সেই বিপুল জলরাশি বরফের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে তাণ্ডব চালিয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসে। কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘আইসিমোড’ (ICIMOD)-এর তথ্যানুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা ৯ মিটার (প্রায় ৩০ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
নেপাল পুলিশ ইতিমধ্যে চার শতাধিক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি বহুগুণ ভয়াবহ। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের হিসাব মতে, নিহত ও আহত মিলে সম্ভাব্য সংখ্যা অন্তত কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।
কাদামাটি, পাথর ও প্রলয়ঙ্করী স্রোতের নিচে চাপা পড়ে আছে শত শত বহুতল ভবন, পাহাড়ি সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু। এই বিপর্যয়ের বড় শিকার হয়েছেন ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা শত শত বিদেশি পর্যটক এবং কৈলাস মানস সরোবরের পুণ্যার্থী তীর্থযাত্রীরা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলির চন্দননগরের ষাটোর্ধ্ব শিপ্রা রায়ের গল্পটি কিংবা কলকাতার রিনা ব্যানার্জীর পরিবারের আকুলতা— এমন শত শত হৃদয়বিদারক ঘটনার উদাহরণের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা পূরণ করতে মানস সরোবরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তাঁরা। অথচ বুধবার সকালের পর থেকে স্বজনদের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সাথে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক পাহাড়ি পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ‘আইসিমোড’-এর বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে, হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল উল্লেখ করেছেন, লেন্দে খোলা নদীতে গত ১৪ মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ভয়াবহ বন্যার ঘটনা।
পাহাড়ের চূড়ায় অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অতিবৃষ্টির ফলে হিমবাহগুলো অতি দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং ভেতরের বরফের বাঁধ শক্তি হারাচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আছড়ে পড়ছে হাজার হাজার টন কাদা ও বরফগলিত পানি (GLOF)। এটি কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, বরং মানবসৃষ্ট দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ফল।
বিপর্যয়ের এখানেই শেষ নয়। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজ’-এর পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী এক উদ্বেগের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত না হলেও পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা হাজার হাজার টন শিথিল পাথর ও কাদা যেকোনো মুহূর্তে আবারও খসে পড়তে পারে। এর ফলে বন্যা ও ভূমিধসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ’ আঘাত হানার চরম ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমানে উপদ্রুত অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় কাদা-পানি পেরিয়ে উদ্ধারকর্মীরা জীবনবাজি রেখে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। পাহাড় চূড়ায় আটকে পড়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের হেলিকপ্টারে উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও আবহাওয়ার প্রতিকূলতা বারবার বাধা সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেশী নেপালের এই চরম বিপদের দিনে প্রথম সাড়া দানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ-এর নিকট প্রেরিত এক বার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সংকটময় মুহূর্তে যেকোনো সহায়তায় বাংলাদেশ প্রস্তুত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং উদ্ধারকাজে অংশ নিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্পেশালাইজড মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং এক মিনিট নীরবতা পালনসহ নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়। ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসসহ (IFRC) বিশ্ব সম্প্রদায় এই ট্র্যাজেডিতে নেপালের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে দিল যে, প্রকৃতির আক্রোশের সামনে মানবসভ্যতা কতটা অসহায়। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া শত শত জীবনের নীরব আকুতি আজ বিশ্বনেতাদের টেবিলে এক বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে— আমরা কি স্রেফ শোক প্রকাশেই দায় সারব, নাকি হিমালয় অঞ্চলকে রক্ষায় কার্যকর পরিবেশ নীতি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেব?
নেপালিদের এই নিথর স্তব্ধতা ও স্বজনহারা মানুষের কান্না যেন আর কোনো দেশে বা পাহাড়ে ফিরে না আসে। সুতরাং সময় এসেছে হিমালয় অববাহিকাকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করে সমন্বিত পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার। না হলে প্রকৃতির বিপর্যয় থেকে কারোরই রেহাই মিলবে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, দৈনিক আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
নেপাল ট্র্যাজেডি: হরর মুভিকেও হার মানানো জলবোমায় বিধ্বস্ত হিমালয় কন্যা!
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
৪৭ মিনিট আগে
২৮ আগস্ট (শুক্রবার), ২০২৬, ১১ঃ১৬ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
