রোহিঙ্গাদের প্রায় এক দশক ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই মানবিক দায়িত্ব যেন আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়- সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ যে সংকট সৃষ্টি করেনি, তার সমাধানের দায়িত্ব বাংলাদেশের নয়। রোববার রাজধানীতে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) ও অক্সফাম ইন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছর: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের পথে’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের মানবিক উদারতা আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সীমিত ভূমি, উচ্চ জনঘনত্ব ও নিজেদের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ তাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
তবে এর ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক যেন আরও প্রলম্বিত না হয় সেই আহ্বান জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। বলেছেন, এই সময় শুধু ফিরে দেখার নয়, নতুন করে উদ্যোগ নেয়ারও সময়। আমরা ১০ বছরকে ২০ বছরে পরিণত হতে দিতে পারি না। তার মতে, একটি শরণার্থী শিবির কখনোই মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য। চীনের ভূমিকার প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামপ্রতিক চীন সফরের সময় দেশটির নেতৃত্ব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হবে বলে তিনি আশা করেন।
সংলাপের শুরুতে ডিক্যাব সভাপতি একেএম মঈনউদ্দীন এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত সূচনা বক্তব্য দেন। সংলাপে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার, চীনের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইন, আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম-বন্ডে, সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী এবং ডিক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েসসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
প্রত্যাবাসনের পথে নতুন বাধা: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সামপ্রতিক পরিস্থিতি অবশ্য খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আগস্টের মাঝামাঝি মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশে থাকা ৮ লাখ ২৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা থেকে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলে জানিয়েছে দেশটি। এ নিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের নতুন টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ঢাকা বলেছে, মিয়ানমারের পরিসংখ্যান সঠিক নয় এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশে জন্ম নেয়া শিশুদের তথ্যও যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করার বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে চলমান সংঘাতই প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। অর্থাৎ মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গাকে গ্রহণের কথা বললেও তাদের ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আর মিয়ানমারের ভেতরের সংঘাতও কমেনি। জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষদের ওপর হামলা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
