২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। সেখানে কাগজে-কলমে ‘যুদ্ধবিরতি’ চালু থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। এতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে দেড় লক্ষাধিক। সেই সঙ্গে ঘর ছাড়া হয়েছে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় এখন এমন সংকট দেখা দিয়েছে যে লাশ দাফন করার জায়গা পেতেও হিমশিম খাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। তেমনি গাজার ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। তার সামনে এখন এক কঠিন বাস্তবতা- বাবা মোহাম্মদকে কোথায় দাফন করবেন?
৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট একটি দোকানে চা-কফি বিক্রি করছিলেন। গত ১০ জুন ইসরাইলের নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে তার ঘাড়ে একটি গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
বাবার মরদেহ দাফনের জন্য ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, সেখানে কবরের জায়গা প্রায় ফুরিয়ে গেছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে কবরস্থানগুলোতে ঠাসাঠাসি করে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।
অনেক কবরেই স্থায়ী কোনো সমাধিচিহ্ন নেই। শুধু একটি পাথর এবং তার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ লাগিয়ে রাখা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জায়গার সংকট এবং নির্মাণসামগ্রীর অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ওমর আল-জাজিরাকে বলেন, আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছি। চারদিকে বালুর পাহাড়, আর সেই বালুর নিচে মানুষকে দাফন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোথাও শুধু একটি পাথরের সঙ্গে শহীদের নাম লেখা কাগজ লাগানো হয়েছে। যুদ্ধের আগে যেভাবে কবর তৈরি ও প্রস্তুত করা হতো, এখন আর সেভাবে করার সুযোগ নেই।
বর্তমানে গাজায় একটি কবর তৈরির খরচ প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তার ওপর নতুন কবর খোঁজার মতো জায়গাও ছিল না।
নতুন কবরের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের দাদার কবরে বাবাকে দাফন করতে হয়েছে, বলেন ওমর।
গাজায় যুদ্ধের কারণে সেবা ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি হামলার ঝুঁকির কারণে মৃতদের শনাক্ত করা ও যথাযথভাবে দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধের সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে গণনা করা হয়েছে।
অনেককে বাড়ির আঙিনায়, তাবুর পাশে, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরের ভেতরে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাজায় ইসরাইলি হামলার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। এরপর পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে কিংবা অস্থায়ী কবরস্থানে থাকা স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১,২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন হয়েছে নতুন দাফনস্থল। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, গাজায় কবরের সংকট শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধে নিহত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির কারণে নয়। ইসরাইলি হামলায় বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে।
গাজার ধর্মীয় ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে পরিবারগুলোর জন্য দাফনের জায়গা আরও কমে গেছে।
গাজার ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব গত ১৯ বছর ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন। তার মতে, গাজায় চলমান যুদ্ধ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
তিনি যে খান ইউনিস কবরস্থানে কাজ করেন, যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেই কবরস্থানে প্রায় ৬,০০০ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।
