ঢাকার বাতাসে সিসা, ধুলোবালি। ছোট-বড় খাল জলাশয় পলিথিন বর্জ্যে ঠাসা। শিল্প কারখানার কেমিক্যালে নদীর পানি কালো কুচকুচে। ব্যবহার অনুপযোগী। পানিতে মাছও নেই। যানবাহন ও নির্মাণকাজের অতিরিক্ত শব্দ দূষণে ঢাকায় বসবাস করা অনেকেই কানে কম শোনেন। রাজধানীকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প ও আবাসন যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, আশপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে দেশে আইন আছে, আদালত আছে। তারপরও দূষণকারীদের থামানো যাচ্ছে না কেন? একদিকে ঢাকার আশপাশে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণে ত্রাহী অবস্থা, ঠিক উল্টো চিত্র পরিবেশ আদালতের। পরিবেশের ক্ষতি করা অপরাধীদের বিচারে দেশের ৩টি পরিবেশ আদালত আছে। তবে এসব আদালতে মামলা নেই বললেই চলে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার পরিবেশ আদালতে বিচারাধীন মামলা ৮ হাজার ৩২২টি। তবে পরিবেশ অপরাধ সংক্রান্ত মামলা মাত্র ১৮৩টি। এখানে ২০২০ সাল থেকে লম্বা বিরতির পর ২০২৪ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে মাত্র ২টি মামলা দায়ের হয়। পরের বছর মামলা এসেছে মাত্র ৩টি। এমনকি আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৬০৮টি মামলা দায়ের হয়। এরমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৯১টি। এদিকে মামলা না থাকায় পরিবেশ আদালতে অন্যসব ফৌজদারি অপরাধের বিচার চলছে। হত্যা, প্রতারণা, চেক জালিয়াতি, বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলার বিচার চলে পরিবেশ আদালতে।
পরিবেশ আপিল আদালতেও একই চিত্র: ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালতের পরিস্থিতিও খুব একটা ভিন্ন নয়। বর্তমানে সেখানে বিচারাধীন পরিবেশ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা মাত্র ৭টি। অন্যদিকে একই আদালতে অন্য ধরনের বিচারাধীন মামলা রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। গত বছর আপিল আদালতে নতুন পরিবেশ মামলা এসেছে মাত্র ৫টি। এর আগের বছর ছিল ৮টি। আদালত সূত্র বলছে, বিচারাধীন কোনো পরিবেশ মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সব সময় পরিবেশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে প্রভাবশালীরা। বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, ইটভাটার ধোঁয়া, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, প্লাস্টিক দূষণ ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। কিন্তু বিদ্যামান আইনে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। পরিবেশ আদালত আইন-২০১০ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ করতে হয়।
অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ। এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন ছাড়া আদালতে মামলা গ্রহণের সুযোগ নেই। এতে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও তার কোনো সুরাহা হয় না। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিও মেলে না, আর মামলাও হয় না। এতে দূষণকারী ও নদী দখলকারীরা আরও বেপরোয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা প্রক্রিয়াগত জটিলতা, সময়ক্ষেপণ কিংবা প্রশাসনিক বাধার কারণে আইনি লড়াইয়ে এগোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর পরিবেশ দূষণের শিকার ব্যক্তি সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হতে না পারায় বহু অপরাধই বিচারের আওতার বাইরে থেকে যায়।
তদন্তে ধীরগতি, সাক্ষী আসেন না: ঢাকার পরিবেশ আদালতে বছরের পর বছর মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। মামলা হলেও তদন্ত শেষ করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ২০১৬ সালে সাভারে পিকআপ পলিথিন নিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন রাসেল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। পরে পরিবেশ আইনে মামলা দিয়ে তাকে জেলে পাঠায় পুলিশ। অনেকদিন তদন্ত শেষে ২০২০ সালে আদালতে প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। তবে এরপরে মামলার ৫ সাক্ষীর কাউকেই আদালতে হাজির করা যায়নি। ২০১৮ সালে তুরাগ নদীর টঙ্গী এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার অভিযোগে দু’টি ড্রেজার মেশিন জব্দ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে ৫জনকে আসামি করে মামলা দেয়া হয়। মামলায় ২০২১ সালে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। তবে সাক্ষীর অভাবে এই মামলার বিচারকাজও আটকে আছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে ভরসা, কমছে নিয়মিত মামলা: পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে পরিবেশ আইন প্রয়োগে মূলত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল। অবৈধ ইটভাটা, কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, পলিথিন ব্যবহার, পাহাড় কাটা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। পরিবেশ আদালতের নিষ্পত্তি করা মামলাগুলোর বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বেশির ভাগ মামলায় আসামিদের জরিমানা করা হয়েছে, কারাদণ্ডের নজির তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক জরিমানা কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। কারণ আদালতের রায় ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে।
ঢাকার পরিবেশ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাসুদুর রহমান বাদল মানবজমিনকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমেই আদালতে মামলা আসে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি মামলা করতে পারলে মামলার সংখ্যা বাড়তে পারতো, কিন্তু বর্তমান আইনে সে সুযোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শফিকুল আলম বলেন, পরিবেশ আদালত আছে, কিন্তু বছরে মামলা যায় ৪ থেকে ৫টা। একটি আদালত বেকার বসে থাকতে পারে না। তাই অন্য আদালতে চাপ থাকলে সেই মামলা পরিবেশ আদালতে পাঠানো হয়। পরিবেশ মামলার স্বল্পতার কারণে পরিবেশ আদালতেও অন্যান্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতে হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর আদালতে মামলা করার চেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অর্থদণ্ড আরোপকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকায় বহু ঘটনা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না।
