রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রোগী ভোগান্তির শেষ নেই। জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কর্মীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি আইএমইডি’র এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে উন্নত ও কম খরচের চিকিৎসার আশায় আসা রোগীদের পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। ব্যয়বহুল চোখের চিকিৎসা নামমাত্র ১০ টাকার টিকিটে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩ থেকে ৪ হাজার রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগীকে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একাধিকবার হাসপাতালে আসতে হচ্ছে। একদিনে ডাক্তার সহ সবকিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। রেটিনা লেজার থেকে শুরু করে ব্যয়বহুল ইনজেকশন। অনেক চিকিৎসাই এখানে বিনামূল্যে মিললেও ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না রোগীদের।
সরজমিন সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের ভিড়, চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম, জনবল সংকট এবং রোগীদের নানা অভিযোগের চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতালের নিচতলায় প্রবেশমুখেই রয়েছে তথ্যকেন্দ্র। সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন নারী রোগী ও স্বজনদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। কোন বিভাগে যেতে হবে, কোথায় টিকিট কাটতে হবে কিংবা কোন সেবা কোথায় পাওয়া যাবে- এসব বিষয়ে তিনি রোগীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
ভোর থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কর্নিয়ার সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসা রোগীদের প্রথমে নিচতলার আউটডোরে লাইনে দাঁড়িয়ে ১০ টাকার টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এরপর আবার লাইনে দাঁড়িয়েই চিকিৎসকের কক্ষে যেতে হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা। এ সময় চিকিৎসক, নার্স ও আনসার সদস্যদের রোগীদের সামলাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। চাঁদপুর সদর উপজেলা থেকে শ্বশুরকে নিয়ে আসা ফয়সাল বলেন, আমার শ্বশুরের ছানি পড়েছে। প্রথম দিন ১০ টাকায় টিকিট কাটার পর অন্য একটি কক্ষে পাঠিয়েছে। সেখানে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে ধরিয়ে পাঠালো টাকা জমা দেয়ার কাউন্টারে। সেদিন আর কিছু করার সুযোগ পাইনি। এভাবে ওইদিন শেষ। এভাবে করে সাতদিন চলে গেল। এর মধ্যে টেস্টও করিয়েছি। কিন্তু ভেবেছি আজ ভর্তি করানোর জন্য ডেট দেবে। উল্টো আবারো টেস্ট ধরিয়ে দিলো।
গাজীপুর থেকে স্বামীর সঙ্গে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা খাতুন বলেন, তিনদিন লাইনে দাঁড়িয়ে সবকিছু করেছি। এখন ডাক্তার চোখে ইনজেকশন দেয়ার কথা বলেছেন। সেটা দেখাতে আবার রোববার বা বুধবার আসতে হবে। সকাল ৬টায় এসে সিরিয়াল দিতে হবে। শুনেছি, এই ইনজেকশন একদিনে পাঁচজনের বেশি কাউকে দেয়া হয় না। দূর থেকে এসে এভাবে বারবার সিরিয়াল দেয়া আমাদের জন্য এক ধরনের ভোগান্তি। তারপরও যদি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা মেলে।
কুমিল্লা থেকে আসা আজাদ হোসেন বলেন, যেভাবে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, তাতে এখানে আরও জনবল দেয়া উচিত। চিকিৎসকদের কাছ থেকে ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি। কিন্তু কিছু কিছু নার্সের ব্যবহার চরম মাত্রায় অমানবিক।
বহির্বিভাগে রোগী ৩-৪ হাজার: বুধবার দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, টিকিট বিতরণ শেষ হলেও বিভিন্ন চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘ সারি। অনেক রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩ থেকে ৪ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ১৮৩ জন চিকিৎসক কর্মরত। নার্সের অনুমোদিত পদ ২৫১টি হলেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছেন ২১০ জন।
সরজমিন হাসপাতালের ১১৬ নম্বর কক্ষের সামনে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন নার্সের আচরণ নিয়ে একাধিক রোগীর অভিযোগ রয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে প্রতিবেদকও ওই কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করলে লাইনের পেছনে দাঁড়াতে বলা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। বরং নার্সের সঙ্গে কথা বলার সময় তার আচরণ ছিল রূঢ়।
১৬ বছরে শেষ প্রকল্প, তবু জনবল সংকট: সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত এক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রকল্পটির মূল্যায়ন করেছে ইউসুফ অ্যান্ড এসোসিয়েটস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন বছরের মেয়াদে অনুমোদিত ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লেগেছে ১৬ বছর। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০০৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত দফা সময় বাড়ানোর পর ২০১৯ সালে কাজ শেষ হয়। এতে ব্যয় ৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
এত সময় ও ব্যয় সত্ত্বেও হাসপাতালটি এখনো জনবল সংকটে ভুগছে। চিকিৎসক ও নার্সের ১৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে। স্থাপিত ৭০ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের যন্ত্র অচল থাকায় রোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আইএমইডি’র জরিপে দেখা গেছে, রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং চিকিৎসার জন্য একাধিকবার হাসপাতালে আসতে হয়। কেউ কেউ চারবার পর্যন্ত আসতে বাধ্য হন। জরিপে অংশ নেয়া মাত্র ৮ শতাংশ রোগী প্রথমবারই সেবা পেয়েছেন। অধিকাংশ রোগী জানিয়েছেন, প্রেসক্রাইব করা সব ওষুধ বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালে তা পাওয়া যায় না।
এসব সমস্যা সমাধানে আইএমইডি হাসপাতালের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, উন্নত টিকিটিং ব্যবস্থা, কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি সেবার সময় বাড়িয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত করা এবং দুই শিফটে কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
অপেক্ষায় ১০ লাখ ছানি রোগী: দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রতি ৮৩৩ জন অপেক্ষমাণ রোগীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন দক্ষ সার্জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন এর প্রায় চারগুণ।
এ ছাড়া, প্রায় ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশুর চিকিৎসাযোগ্য ছানি থাকলেও তারা এখনো অস্ত্রোপচারের সুযোগ পায়নি। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সার্জনের ওপর প্রায় এক হাজার রোগীর দায়িত্ব থাকলে অপেক্ষমাণ রোগীর চাপ কমানো সম্ভব নয়।
কেন বাড়ছে রোগীর ভিড়: রোগীর চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ এখানে ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিনামূল্যে দেয়া হয়। চোখের রেটিনার লেজার চিকিৎসা, ব্যয়বহুল ইনজেকশনসহ অনেক সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। বাইরে যেখানে একটি রেটিনা লেজার অপারেশনে প্রায় এক লাখ টাকা এবং প্রতিটি ইনজেকশনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকার টিকিটে এসব চিকিৎসা পাওয়া যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় সব সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এইচইএম রেজওয়ানুর রহমান সোহেল মানবজমিনকে বলেন, আউটডোরে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী আসেন। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সব সময় সুচিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যেকোনো রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে হাসপাতালের সব স্টাফই প্রস্তুত থাকেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী দেখেন আউটডোরের চিকিৎসকরা। এরপরও সময় থাকলে জরুরি কিছু রোগীর জন্য অতিরিক্ত ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নামমাত্র স্বল্পমূল্যে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেই উন্নতভাবে করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কিছু কিছু ওষুধ বিনামূল্যেও দেয়া হয়।
