বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কাটাতে সময় লাগবে

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কাটাতে সময় লাগবে

ফন্ট সাইজ:

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সংকট দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এটি বর্তমান সরকারের তৈরি সমস্যা নয়; আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া একটি ‘ইনহেরিটেড’ বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট। তবে সরকার বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগাচ্ছে। ধীরে ধীরে এ সংকটের উন্নতি হবে।

শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতির বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই। তাই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিটি এনার্জি সেক্টরে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মজুতের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৭ দিনের মজুতও ছিল না। এখন তা এক মাসে উন্নীত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি খাতে তিন মাসের মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কারণ অর্থনীতির উন্নয়নে জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই শিল্প খাতকে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে আমীর খসরু বলেন, এর প্রভাব খেলাপি ঋণের ওপরও পড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ডসহ একটি প্যাকেজ দিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে থাকলেও বাস্তবে যদি তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে শুধু কাগজে ঋণ দেখিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করে প্রকৃত তারল্য তৈরি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজ আগামী ১লা সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। যোগ্য হওয়ার পরও কোনো ব্যাংক বাধার মুখে পড়লে বিষয়টি সরকারকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ নেয়া হয়েছে বলেও জানান আমীর খসরু। তবে অতীতে এ ধরনের অর্থায়নে অনিয়ম ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।

তিনি বলেন, এবার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ রাখা হবে না। আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগও দেয়া হবে না। আর্থিক খাতকে বাজারের নিয়মে পরিচালনা করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।

সেমিনারে সিপিডি’র বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আগের বাস্তব আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তার প্রশ্ন, এত বড় প্রবৃদ্ধি আদৌ বাস্তবসম্মত কি না।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশের মতো হওয়ায় বিনিয়োগে বড় বাধা তৈরি হচ্ছে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কিউআর কোডের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। জনগণ যে পরিমাণ ভ্যাট দেয়, তার একটি বড় অংশ যেন সরকারি কোষাগারে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। সরকারের কাজ হওয়া উচিত ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সঠিক নীতিকাঠামো তৈরি করা। তিনি বলেন, দেশে সুরক্ষিত বাজার থাকায় অনেক উদ্যোক্তার জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করা রপ্তানির চেয়ে বেশি লাভজনক। ফলে নন-গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়াতে হলে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করতে হবে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগে এমন অনেক বাধা রয়েছে, যেগুলো সরাসরি সরকারি রাজস্বে যায় না, কিন্তু অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা তৈরি করে। তিনি এটিকে ‘হয়রানি কর’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন অনুমোদন, সার্টিফিকেশন ও সরকারি দপ্তরের কাজে অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর সময়ের বড় ব্যয় চাপছে। এই ‘হয়রানি কর’ কমাতে এক বছরও লাগার কথা নয়, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন শুধু ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা রেজিলিয়েন্সের কথা বললে হবে না; অর্থনীতিতে গতি বা ‘স্পিড’ আনতে হবে। দেশের প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত সংস্কার ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব খেলাপি ঋণ ইচ্ছাকৃত খেলাপির কারণে তৈরি হয়নি। ব্যবসা পরিচালনায় দীর্ঘদিন অনুমোদন না পাওয়া, পরিবেশগত বা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়েছে। তাই খেলাপি ঋণের কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার হ্রাস ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ডিসিসিআই।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সুদের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে, যদিও এরই মধ্যে ৫০ বেসিস পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫.৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিকে বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।

একইসঙ্গে রপ্তানির ক্ষেত্রে লিড টাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও জোর দেন। সিএমএসএমই খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, এ খাতে প্রকৃত ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা মাত্র ১৬.৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে ২৪.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করা দরকার। একইসঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অফশোর গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।