সকালে মাদারীপুর থেকে ঢাকায় আসেন আবু রায়হান। মামলায় ফাইলপত্র নিয়ে আদালতের বাহিরে দাঁড়িয়ে। আইনজীবীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দুপুরে মামলার শুনানি হওয়ার কথা। কিন্তু এজলাসে গিয়ে দেখেন বিচারক আসেননি। অন্য আদালত থেকে অতিরিক্ত দায়িত্বের বিচারক আসবেন। কখন আসবেন তাও কেউ জানেন না। নিয়মিত বিচারক না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রায়হানের মতো আরও শতশত বিচারপ্রার্থীর। মূলত সাগর পথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার চুক্তি করে ঢাকার নয়া পল্টনের একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে টাকা দিয়ে প্রতারিত হন রায়হান। পরে ঢাকার মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। তদন্ত শেষে দেড় বছর পরে চার্জশিট দেন পুলিশ। অভিযোগপত্র দেয়ার পর বছর পেরিয়ে গেছে। মামলার বিচার কাজ এখনো থমকে আছে। মামলার তারিখের পর তারিখ যায়। বিচার শেষ হয় না। আসামি গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পরেই জামিনে বেরিয়ে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে বিচারকের পদোন্নতি ও বদলি অব্যাহত থাকায় নিয়মিত বিচারক নেই। প্রায় সাড়ে ৩ মাস ধরে বিচারকশূন্য রয়েছে ট্রাইব্যুনালটি। বিচারক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বিচারপ্রার্থীরা। ঢাকা মহানগর আদালতের নিচে কথা হয় আবু রায়হানের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, সেই মাদারীপুর থেকে প্রতি মাসে আসছি আর যাচ্ছি। তারিখ অনুযায়ী আইনজীবী ঠিকই দাঁড়ান। কিন্তু বিচারক আসেন না। তিন মাস ধরে এমনভাবেই চলছে। শুনলাম বিচারক বদলি হয়ে গেছেন। এরপর আর কোনো বিচারক নিয়োগ হয়নি। শুধু মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল নয়, নিয়মিত বিচারক নেই ঢাকার সিএমএম আদালতের ৫টি কোর্টে।
সেখানে অন্য কোর্টের বিচারক এসে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যেসব আদালতে বিচারক নেই তার মধ্যে রয়েছে- সিএমএম-১৯, সিএমএম-২০, সিএমএম-২৬, সিএমএম-৩১, সিএমএম-৩২ ও সিএমএম-৩৭। এসব কোর্টের বিচারক বদলির পর আর নিয়োগ হয়নি। ফলে অন্য আদালতের বিচারকদের এসে খালি হওয়া কোর্টে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এতে কার্যতালিকায় থাকা সব মামলার শুনানি করতে পারছেন না। ভারপ্রাপ্ত বিচারক পূর্ণ সময় না দেয়ায় মামলা ঝুলে যাচ্ছে। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। আইনজীবীরা বলছেন, যেসব আদালতে বিচারক নেই। সেসব আদালতে অন্য কোর্টের বিচারক এসে মামলার শুনানি নিচ্ছেন।
সকালে নিজের কোর্ট সামলে দুপুরে ফাঁকা আদালতে এসে সময় দিচ্ছেন। এসেই এক দুই ঘণ্টা এজলাস চালিয়ে চলে যাচ্ছেন। দুই একটা মামলা শুনেই পরবর্তী তারিখ দিয়ে চলে যান। এতে অধিকাংশ বাদী আসামির মামলা শুনানি না হওয়ায় তাদের ফেরত যেতে হয়।
সরজমিন দেখা যায়, কোনো কোনো আদালতে ৩ মাস। আবার কোনো কোনো আদালতে ৪ মাসের অধিক সময়েও বিচারক নিয়োগ হয়নি। সকালে নিজস্ব আদালতে কাজ করে শূন্য কোর্টে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বিচারকরা। কিছু আদালতের বিচারক বদলি হওয়ায় ওই আদালতগুলো বিচারকশূন্য রয়েছে। নির্ধারিত তারিখে আদালতে এসেও ফিরে যেতে হচ্ছে। বিচারক না থাকায় মামলার শুনানি হচ্ছে না। মামলা ঝুলে যাচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঢাকার আদালতপাড়ায় মোট ১২৩টি আদালত রয়েছে। এসব আদালতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা বিচারধীন। যেসব আদালতে বিচারক নেই: ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতের ১০টি আদালতের মধ্যে তিনটিতে নিয়মিত বিচারক নেই। এর মধ্যে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ ও ৪ রয়েছে। এছাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদেও একজন বিচারক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা জজ আদালতের অফিসিয়াল সূত্র অনুযায়ী, এখানকার ১০৫টি আদালতের মধ্যে ৬০টিতেই নিয়মিত বিচারক নেই। সূত্র জানায়, যুগ্ম দায়রা জজ আদালত-১ থেকে ৮ পর্যন্ত কোনো আদালতেই বর্তমানে নিজস্ব বিচারক নেই। এছাড়া জেলা জজ আদালতের অধীন সিনিয়র সিভিল জজ ও সিভিল জজ আদালতের মোট ৪০টি আদালতের মধ্যে ২৫টিতেই বিচারক নেই। ঢাকার পারিবারিক আদালতের ১৪টিতেই নিজস্ব বিচারক নেই। অন্য আদালতের বিচারক এসে কোনোরকম বিচারকাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। এতে পারিবারিক সংক্রান্ত মামলার ভোগান্তি বেড়েছে।
জেলা জজ আদালতের অধীন পারিবারিক আদালতের সংখ্যাও কম নয়। মোট ১৪টি পারিবারিক আদালতের একটিতেও নিজস্ব বিচারক নেই। এসব আদালতের মামলাগুলো বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন সিনিয়র সহকারী জজ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের ৯টি আদালতেও নিয়মিত বিচারক নেই। এসব আদালতের মামলাগুলো বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা জজরা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পরিচালনা করছেন। এছাড়া চারটি বাণিজ্যিক আদালতেও নিয়মিত বিচারক নেই। এসব আদালতের দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকার বিভিন্ন অতিরিক্ত জেলা জজ। অর্থঋণ আদালতেও নিজস্ব বিচরক নেই। ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ইমরুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, বিচারক না থাকায় অনেক ভোগান্তি হয়। বিচারক নেই শুনানি হয় না কিন্তু আমরা মক্কেলকে এটা বোঝাতে পারি না। তারা দ্রুত কাজ চায়। সিএমএম কোর্টে বিচারক আসা- যাওয়ার মধ্যে থাকে তবে এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিচারপ্রার্থীরা। বার এবং রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে জরুরী পদক্ষেপ নিবে বলে আশা করি।
এ বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, আসলে এ বিষয়ে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। তবে যে আদালতে বিচারক থাকেন না আমরা ওই সংশ্লিষ্ট আদালতে যিনি প্রধান জজ আছেন, তাকে অবহিত করেছি। তবে শুনেছি ইতিমধ্যে কয়েকটি কোর্টে বিচারক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী মানবজমিনকে বলেন, আমরা যেসব আদালত শূন্য আছে তা আইন মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় এটা নিয়ে কাজ করছে। দ্রুতই নিয়মিত বিচারক নিয়োগ হবে।
