অনাগত সন্তানের মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সংসারে দুই কন্যাসন্তানও রয়েছে। এরইমধ্যে ঋণের বোঝা ও মানসিক চাপ যেন গ্রাস করে নেয় সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা এম আই সাহিদ হোসেনকে (৩৫)। শেষ পর্যন্ত নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি। তবে অনাগত সন্তানের মুখ আর দেখা হলো না তার। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকার ইমাম হোসেনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাহিদের মৃত্যু হয়।
নিহত সাহিদ হোসেন ওই এলাকার মৃত ইকবাল হোসেনের ছেলে। তার মা মমতাজ বেগম। ২০২১ সালে পারিবারিকভাবে একই এলাকার শারমিন আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে মিরা আক্তার ও মির্জা আক্তার নামে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। বর্তমানে স্ত্রী শারমিন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সাহিদের স্ত্রী শারমিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার পর থেকেই ঋণের চাপে পড়ে যান আমার স্বামী। তিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করতেন। সর্বশেষ তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি শাখায় বদলি করা হয়েছিল।’ চট্টগ্রাম থেকে দূরে হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি নিজেই চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে হাটহাজারী শাখায় ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘চাকরি ছাড়ার পর থেকে তিনি বেকার ছিলেন। ব্যবসা করার কথা বলে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা নিয়েছিলেন। তার নিজেরও ঋণ ছিল, আবার অনেকের কাছে টাকা পাওনাও ছিল। তবে মোট কতো টাকা ঋণ ছিল, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না।’ শারমিন বলেন, ‘আমাদের দুই মেয়ে। আমি এখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানকে ঘিরে আমরা সবাই অপেক্ষায় ছিলাম।
এর মধ্যেই ঋণের চাপ ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলো। তার মৃত্যুতে আমাদের পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছি।’ সাহিদের মা মমতাজ বেগম বলেন, অন্যান্য জুমাবারে মতো এই দিন ও পাঞ্জাবি পরে জুমার নামাজ পড়েছিল সাহিদ। রাতে আমাদের বাসা থেকে শ্বশুরের বাসায় যায় সে । তখন সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। সকালে শুনি ছেলে গুলি খেয়েছে। আমার খুব দুঃখ লাগছে ছেলে কেন এমন করলো। বৌটা সন্তানসম্ভবা এই অবস্থায় কেন এমন করলো সেটা তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলতে পারবে। জানা গেছে, শনিবার সকালে বাসার ড্রয়িংরুমে নিজের মাথায় পিস্তল দিয়ে গুলি করেন সাহিদ। গুলির শব্দ পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম আশেক বলেন, ‘সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে গুরুতর আহত অবস্থায় সাহিদ হোসেনকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়।
স্বজনদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়ায় ইমাম হোসেনের বাড়ির ড্রয়িংরুমে তিনি নিজের মাথায় পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ২৮নং নম্বর ওয়ার্ডে পাঠান। সকাল ১০টার দিকে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’ সাহিদের কাছে পিস্তল থাকার বিষয়টি আগে জানতেন না বলে জানান তার স্ত্রী। তিনি বলেন, অস্ত্রটি কোথা থেকে এসেছে কিংবা এর কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। এর আগেও সাহিদ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান শারমিন। তিনি বলেন, ‘তখনো তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা ছিল। পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও ছিল।’
এদিকে সাহিদের কাছে থাকা পিস্তলটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। অস্ত্রটি কীভাবে তার কাছে এলো এবং এর বৈধতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনূর আলম বলেন, ‘পারিবারিক কলহের জেরে নিজের মাথায় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি এবং অস্ত্রটির উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাহিদ প্রায় এক বছর আগে ব্যাংকের চাকরি ছেড়েছিলেন। এরপর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।’
