খামেনি-পরবর্তী ইরান: শাসন বদল নাকি কাঠামোর পুনর্গঠন?

খামেনি-পরবর্তী ইরান: শাসন বদল নাকি কাঠামোর পুনর্গঠন?

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলো ছিল টানা অস্থিরতার। গাজা থেকে লেবানন, ইয়েমেন থেকে লোহিত সাগর ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র শক্তিগুলোর ওপর ধারাবাহিক চাপ অঞ্চলটিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে যে নাটকীয় ঘটনা ও দাবি সামনে এসেছে, তা ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। প্রশ্নটি সরল কিন্তু গভীর। একজন সর্বোচ্চ নেতার বিদায় কি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ডেকে আনতে পারে? নাকি এই ব্যবস্থা আবারও নিজেকে নতুন রূপে টিকিয়ে রাখবে?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে টালমাটাল দুই বছরের শেষে ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের যৌথ অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর শুধু তেহরানকেই নয়, পুরো অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত কেঁপে উঠবে?

ইরানের শাসনকাঠামো ব্যক্তি-নির্ভর হলেও কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি যে ‘ বেলায়াতে ফকিহ’ ধারণার ভিত্তিতে রাষ্ট্র নির্মাণ করেন, সেখানে সর্বোচ্চ নেতা সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বলয় অভিভাবক পরিষদ, বিশেষজ্ঞ পরিষদ, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং বিচার বিভাগ। আজ নেতৃত্ব পরিষদে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসাইন মোহসেনি এজেয়ি এবং আলিরেজা আরাফির অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে, ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণে তেহরান প্রস্তুত।
ইতিহাস বলছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা বহিরাগত চাপকে প্রায়শই জাতীয়তাবাদের শক্তিতে রূপান্তর করেছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক চুক্তি প্রতিটি সংকটে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বদলে আরো কঠোর হয়েছে। ফলে একজন নেতার অনুপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থার পতন ডেকে আনবে এমন ধারণা সরলীকৃত। বরং ক্ষমতার ভেতরের বিভিন্ন গোষ্ঠী ধর্মীয় নেতৃত্ব, আইআরজিসি, নির্বাচিত সরকার এখন নতুন ভারসাম্য রচনায় তৎপর হবে।

অন্যদিকে, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কি এই শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনা সম্ভব? সামরিক শক্তি দিয়ে নেতৃত্বকে আঘাত করা যায়, কিন্তু আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভাঙা কঠিন। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে বাহ্যিক হস্তক্ষেপে শাসন বদলালেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না। ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল; কারণ দেশটির রয়েছে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়, আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শিকড়।
তবে এটাও সত্য, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ এবং সামাজিক পরিবর্তনের চাপ শাসনব্যবস্থাকে নীরবে ক্ষয় করছে। খামেনির ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ছিল অনেক দ্বন্দ্বের ওপর ছাতা। তাঁর অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের আগে নেতৃত্ব পরিষদের হাতে যে সাময়িক ক্ষমতা, তা ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দেবে।

সুতরাং, একজন শীর্ষ নেতার উৎখাত মানেই শাসনব্যবস্থার অবসান নয়; বরং এটি এক পুনর্গঠনের সুযোগ ও ঝুঁকি দুই-ই। বাহ্যিক শক্তি পরিবর্তনের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু স্থায়ী রূপান্তর নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির ওপর। খামেনি-পরবর্তী ইরান হয়তো আরও কঠোর হবে, কিংবা ধীরে ধীরে সংস্কারের পথে হাঁটবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণে নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন