খামেনির অবসান: তেহরান থেকে তেলআবিব—মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূকম্পন

খামেনির অবসান: তেহরান থেকে তেলআবিব—মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূকম্পন

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো কেবল একটি দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর হত্যার খবর তেমনই এক নিয়তিনির্ধারক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে এই তথ্য জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তা নিশ্চিত করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তেহরান থেকে ওয়াশিংটন, তেলআবিব থেকে রিয়াদ—সবখানেই শুরু হয়েছে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা।

খামেনির ৩৬ বছরের শাসন ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক কৌশলের এক মিশ্রণ। তার মৃত্যু কেবল একজন নেতার অবসান নয়; এটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

এক.
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। সে সময়ে নির্বাসন থেকে ফিরে এসে রুহোল্লাহ খোমেইনি রাজতন্ত্র উৎখাত করেন এবং পাহলভি বংশের শাসনের অবসান ঘটান। শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। রাজতন্ত্র বনাম ধর্মীয় শাসন—এই দ্বন্দ্ব কেবল ক্ষমতার লড়াই ছিল না; এটি ছিল ইরানের রাষ্ট্র-চরিত্রের পুনর্নির্ধারণ। বামপন্থী ও ইসলামপন্থী শক্তির জোটে গড়ে ওঠা বিপ্লব দ্রুতই একটি ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপ নেয়। নতুন সংবিধানে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ পদটি এমনভাবে সংরক্ষিত হয়, যা নির্বাচিত সরকারের ওপরও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা হন আলী খামেনি। শুরুতে তাকে আপসের প্রার্থী হিসেবে দেখা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হন—সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, বিচারব্যবস্থা ও গার্ডিয়ান কাউন্সিল—সব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব সুসংহত হয়।

দুই.
খামেনির শাসনামলে ইরান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া, সিরিয়ায় আসাদ সরকার—এই সমর্থন কাঠামো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ায়। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (JCPOA) ইরানের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি আনলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তা থেকে ওয়াশিংটনের সরে দাঁড়ানো নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সৃষ্টি করে। ইসরাইল বরাবরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখেছে। ফলে ছায়াযুদ্ধ, সাইবার হামলা, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা—এসব দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল।

গত বছরের ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরাইল সংঘর্ষ সেই ছায়াযুদ্ধকে প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ দেয়। প্রথম দফার হামলায় একাধিক পরমাণু বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন। তখনই স্পষ্ট হয়েছিল—খামেনিও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারেন।

তিন.
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের। জানা যায়, সম্ভাব্য অস্থিরতার কথা মাথায় রেখে খামেনি আগেই এই পরিষদকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আইনবিদকে নিয়ে একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলে আইনজ্ঞ হিসেবে আলিরেজা আরাফির অন্তর্ভুক্তি এবং এক্সপিডিয়েন্সি ডিসসার্নমেন্ট কাউন্সিলের ঘোষণা দেখায়—রাষ্ট্রযন্ত্র এই পরিস্থিতির জন্য পূর্বপ্রস্তুত ছিল। অর্থাৎ, ক্ষমতার শূন্যতা যাতে দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সে ব্যবস্থা আগেই নেওয়া হয়েছিল।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়: নতুন সর্বোচ্চ নেতা কি খামেনির নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি পরিবর্তনের আভাস দেবেন?

চার.
খামেনির শাসনামলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে—এ অভিযোগ বহুবার উঠেছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে হিজাব-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তা রাষ্ট্রের নৈতিক পুলিশিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিস্তৃত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল। নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক সংকট। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন—নিষেধাজ্ঞা-আক্রান্ত অর্থনীতি সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়ায়। গত বছরের ডিসেম্বরের আন্দোলনে স্লোগান ওঠে—“ইসলামিক রিপাবলিকের অবসান চাই।”

এই প্রেক্ষাপটে খামেনির মৃত্যু সরকারবিরোধী শক্তির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। নির্বাসিত শাহপুত্র রেজা পাহলভি ইতোমধ্যেই গণভোট ও নতুন সংবিধানের দাবি তুলেছেন। তার বক্তব্য—ইরানের ভবিষ্যৎ জনগণের রায়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

পাচঁ.
খামেনির মৃত্যুর খবর ঘোষণার পর ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার না করলেও তেহরানে ‘হৃদপিণ্ডে হামলা’র প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি অনুসরণ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এক. ইরান কি সরাসরি প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ নেবে? দুই. পারমাণবিক কর্মসূচি কি আরও ত্বরান্বিত হবে? তিন. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন কি আঞ্চলিক নীতিতে প্রভাব ফেলবে?

ইরানের বিপ্লবী গার্ড (IRGC) দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আদর্শিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। খামেনির অনুপস্থিতিতে তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব আপসের পথে হাঁটে, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ও শুরু হতে পারে।

ছয়.
১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব-সংকট। খোমেইনি থেকে খামেনি—এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিকে অটুট রেখেছিল। এখন প্রশ্ন—তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা কি একই আদর্শিক দৃঢ়তা বজায় রাখবেন? ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে, ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। তাই তাৎক্ষণিক পতনের সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে জনমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক চাপ মিলিয়ে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবন ও শাসন ইরানের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন বিপ্লবের রক্ষক; সমালোচকদের চোখে কর্তৃত্ববাদী শাসক। তার মৃত্যু সেই বিতর্কের অবসান ঘটায়নি—বরং তা আরও তীব্র করেছে।

আজ ইরান এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রতিশোধের রাজনীতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা, অন্যদিকে সংস্কারের দাবি ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ইসলামী প্রজাতন্ত্র কি আরও কঠোর হবে, নাকি নতুন সামাজিক চুক্তির দিকে অগ্রসর হবে—তা নির্ভর করবে আসন্ন নেতৃত্ব, জনগণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপথের ওপর।

এক মানুষের অবসান কখনও কখনও এক যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে। তবে রাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রতিটি সমাপ্তিই সম্ভাব্য নতুন শুরুর ইঙ্গিত বহন করে। ইরানের ভবিষ্যৎ সেই নতুন শুরুর পথেই কি হাঁটবে, নাকি অতীতের ধারাবাহিকতাকেই আরও দৃঢ় করবে—তার উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী দিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও জনগণের সম্মিলিত প্রত্যাশায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন