জীবনের মঞ্চে দ্যুতিময় ফখরুল

জীবনের মঞ্চে দ্যুতিময় ফখরুল

ফন্ট সাইজ:

‘স্পেন বিজয়ী মুসা’ নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে স্কুল জীবনে ব্যাপক সুনাম কুড়ান তিনি। ঠাকুরগাঁও হাইস্কুলে অত্যন্ত মঞ্চসফল ঐতিহাসিক এ নাটক তাকে সে সময় ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বত্র পরিচিতি এনে দেয়। আর পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
আজ তিনি তার কর্মসফল জীবনে গোটা বাংলাদেশকে জয় করে নিয়েছেন। আজ শুক্রবার দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করবেন। তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আমি তাকে নিয়ে গর্বিত। কারণ এই মানুষটিই আমার বন্ধু। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, এই বার্ধক্যেও তিনি আমার অকৃত্রিম সুহৃদ। অন্তরঙ্গ স্বজন।

রাষ্ট্রপতি একটা মর্যাদাপূর্ণ পদ। এই পদে যিনি অধিষ্ঠিত হবেন, তিনি হবেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি চরিত্র মাধুর্যে ও কর্মগৌরবে সকলের কাছে অনুসরণীয়। রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে সবসময় আলো ছড়াবেন। দেবেন সুমহান দিকনির্দেশনা। এসব বিবেচনায় সংশয়াতীতভাবে একজন যোগ্য ব্যক্তি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই মানুষটি বেড়ে উঠেছে তার প্রিয় জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে। একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, মির্জা আলমগীরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আপনি তুমি নয়। তুই।
শৈশবে যখন তার জীবনের পথচলা শুরু হয়েছে তখনই তার মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছে এমন সব গুণাবলী যা ছিল একজন মানুষের কাক্সিক্ষত। হ্যাঁ, ভালো মানুষ, বড় মানুষের জন্য অপরিহার্য। আমরা যারা তার বন্ধু, তারা দেখেছি এক আশ্চর্য প্রসারিত হৃদয়ের অধিকারী হয়ে সৌজন্য ও বিনয়ের আচরণগুলো আয়ত্ত করে সকলের সঙ্গে মিলতো। বয়োজ্যেষ্ঠদের যেমন সম্মান দিতো, তেমনি ছাড়িয়ে রাখতো সকলের জন্য ভালোবাসা অফুরান। বন্ধুদের- সহপাঠীদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ছিল খুবই আন্তরিক। তার বাবা মির্জা রুহল আমিন একজন রাশভারী অথচ প্রাণখোলা মানুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। আমাদেরকে সন্তানস্নেহে ভালোবেসেছেন। প্রয়োজনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতাম, তিনি আমাকে তার বেডরুমে ডেকে নিতেন। বলতেন এলাকার নানা উদ্যোগ প্রসঙ্গের কথা।

আরও পড়ুন:
এক্সিলেন্সি

আলমগীরও তার যোগ্য পিতার মতোই অন্তরঙ্গতায় জড়াতো সকলকে। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ছিল আশ্চর্য প্রাণময়। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগ ছিল সুগভীর। আর সে কারণেই এ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান আয়োজনে ছিল খুব তৎপর। সংগীত ছিল তার ভালোবাসা। গান শুনতো আর তার মধ্যদিয়ে লালন করতো পরিশীলিত জীবন-চেতনা। আবৃত্তি করতো অসাধারণ। আজও তার বক্তৃতায় কবিতার পঙক্তি উদ্ধৃত করে। তাকে কেন্দ্র করেই সত্তরের দশকে এবং তারও পরবর্তীকালে ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গন মুখর হয়ে উঠেছিল। গানে কবিতায় ছড়িয়ে যেতো জীবনঘনিষ্ঠ উচ্চারণ। এসবই হয়েছিল তারই হাত ধরে। ঠাকুরগাঁওয়ের অন্যতম প্রধান সংগীত প্রতিষ্ঠান ‘নিক্কন সংগীত বিদ্যালয়’ যেসব পরিবেশনা মঞ্চে উপস্থাপন করতো তা ছিল তারই পরিকল্পনায় সমৃদ্ধ। নাটকেও সে অভিনয় করতো দারুণ। নাটক বা থিয়েটারের মধ্যদিয়ে জীবনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করতো। স্কুলের বার্ষিক নাটকে সবসময়ই অংশ নিতো। ঠাকুরগাঁও হাইস্কুলে একবার একটি অত্যন্ত মঞ্চসফল ঐতিহাসিক নাটক ‘স্পেন বিজয়ী মুসা’ অভিনীত হয়। সেই নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে মির্জা আলমগীর। আমিও ছিলাম সেই নাটকের নাম ভূমিকায়।

স্কুলের কিংবদন্তিতুল্য হেড মাস্টার শ্রদ্ধেয় রুস্তম আলী খান ছিলেন এই নাটক মঞ্চায়নের উৎসাহদাতা। নাটকটি এতই মঞ্চসফল হয়েছিল যে, পরবর্তীতে স্কুলের ডায়মন্ড জুবিলী উৎসবে আবার অভিনীত হয়। আমরা তখন সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম। ঠাকুরগাঁওয়ে যখন নবনাট্য আন্দোলনের সূচনা হয় সেই সময় ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরগাঁও নাট্য সমিতির মঞ্চে অভিনীত অনেক নাটকে অংশ নিয়েছিল মির্জা আলমগীর। আর সেসব নাটকে তার অভিনয় নৈপুণ্য দর্শকদের মুগ্ধ করতো।
ভাবা যায়! আজকের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একসময় দক্ষ অভিনেতার মতো মেকআপ নিয়ে মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় আবির্ভূত হতো! সেই মানুষটি বর্তমানে জীবনের মঞ্চে দ্যুতিময়।

ক্রীড়াঙ্গনেও তার ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। ক্রীড়া সংগঠন ছাড়াও ছিল ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রিকেট দলের এক নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। ব্যাট হাতে মাঠে বলকে সীমানা পার করতো। দৃশ্যটি কল্পনা করলে আজ বিষ্ময় অভিভূত হতে হয়। এখন মাঠের সীমানা অনেক বিস্তৃতÑ সমগ্র দেশ। এই দেশেরই কর্ণধার হয়ে ছড়াবে আলো।
সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সংবেদনশীল এক দরদি মানুষ ছিল। তখন থেকেই মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অফুরান। কেউ বিপদে পড়লে পাশে এসে দাঁড়াতো। জোগাতো শক্তি ও সাহস। অসুস্থতায় মানুষ যখন অসহায় বোধ করতো, তখন এগিয়ে আসতো, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতো। কেউ আর্থিক সংকটে পড়লে তাকে নিজের সামর্থ্য উজার করে সাহায্য করতো। সে ছিল এই এলাকার এক হৃদয়বান ব্যক্তিত্ব। বন্যাকবলিত হলে ছুটে আসতো দুর্গতদের মধ্যে। অংশ নিতো ত্রাণ বিতরণেও। মানুষের প্রতি ভালোবাসায় সমর্পিত এই মানুষটি মানুষের সঙ্গে আচরণে ছিল অত্যন্ত বিনম্র। এই বিনম্রতা শিক্ষার বিনম্রতা নয়, স্বভাবের বিনম্রতা। ভদ্রতা শিষ্টাচারের সে ছিল এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানবিক গুণাবলীতে সে ছিল দারুণ দীপ্র। মানুষ যেখানে সংকটে দিশাহারা সেখানে ছুটে যেতো সমতার হাত নিয়ে। তার হাতের স্পর্শে সর্বত্রই যেন এক স্বস্তির বাতাবরণ তৈরি হতো। সংকটে ম্রিয়মান মানুষ উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো। জেগে উঠতো তার অভয় মন্ত্রে। আর এভাবেই সে হয়ে উঠেছিল পরদুঃখকাতর এক অন্তরঙ্গ মানুষ। আশ্চর্য প্রাণশক্তির অধিকারী মির্জা আলমগীর বয়স্কদের কাছে ছিল স্নেহধন্য। এই শহরের সবাই তাকে ভালোবাসতো খুব। এটা কোনো বানানো কথা নয়, সত্য উচ্চারণ। ভদ্রতা ও শিষ্টাচার বজায় রেখে চলতো, মিলতো সকলের সঙ্গে। আশ্চর্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর এই মানুষটি নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই অর্জন করেছিল সকলের আস্থা ও বিশ্বাস কোনো সংকীর্ণতা কখনো তাকে অক্ষুণ্ন করতে পারেনি। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই ছিল তার কাছে আপনজন। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে সকলকে একত্রিত করার ক্ষমতা ছিল তার। তার উদারতায় আকৃষ্ট হয়ে কতো মানুষ যে আশ্রয় খুঁজতো, পেতো নির্ভরতার ঠিকানা তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু বলবো সে ছিল এক সজ্জন ব্যক্তি। কোনো বিভাজন বা বৈষম্য তার মনে স্থান পায়নি কখনো। সম্প্রীতির চন্দ্রাতপে ঢেকে রাখতো সকলকে।
সেই মানুষটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানিত পদ অলঙ্কৃত করতে যাচ্ছে। তাই বন্ধু হিসেবে তাকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এখানেও তার কর্মধারা জাতিকে নতুনভাবে প্রাণিত করবে। বাংলাদেশ হয়ে উঠবে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র।
লেখক: শিক্ষাবিদ, ঠাকুরগাঁও।