কথা ছিল নতুন জামা-চকোলেট আর খেলনা নিয়ে ফিরবেন বাবা-মা ও ছোট্ট ভাই। রাতে ঘুমানোর আগে ভিডিওকলে দেশে রেখে যাওয়া কন্যা মহিমাকে দেখিয়েও ছিলেন। কিন্তু কলকাতার হোটেলের আগুন মহিমার সেই স্বপ্ন ছাই করে দিয়েছে। চকোলেট আর খেলনার বদলে অপেক্ষা করছে বাবা-মা আর ভাইয়ের লাশের। কুষ্টিয়া শহরের বাড়িতে দেয়ালে টাঙানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে নির্বাক তাকিয়ে মহিমা। পাশেই একমাত্র পুত্র সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন মা স্বপ্না দত্ত। শোকে স্তব্ধ বাবা দিলীপ কুমার দত্তও। আশপাশের আত্মীয়স্বজন এই বৃদ্ধ দম্পতিকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই থামাতে পারেনি এই বৃদ্ধা মায়ের আহাজারি।
কীভাবে তিনি নিজেকে সামলাবেন। কলকাতার হোটেলের আগুন কেড়ে নিয়েছে পুত্র দেবাশীষ, পুত্রবধূ আফসানা শারমিন, তিন বছরের নাতি স্বর্ণশীষ দত্ত ও বেয়াই আকরাম আলীর প্রাণ। পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন দেবাশীষ। এখন কে তাদের দেখবে। কে কিনে দেবে ওষুধপত্র। কে দেবে বাসাভাড়া। কাকে বাবা-মা বলে ডাকবে মহিমা। এসব বলে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা স্বপ্না। বুধবার বিকালে কুষ্টিয়া শহরের আরওয়াপাড়ায় যেতেই দেখা গেল, একটি বাসার সামনে শত শত মানুষের ভিড়। বাসার ভেতর থেকে ভেসে আসছে আহাজারির শব্দ। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো, একটি রুমে ছোট্ট মহিমাকে ঘিরে আছে কয়েক সহপাঠী। দেয়ালে টানানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সে তখনো বুঝতে পারেনি, তার জীবনে কী হারিয়েছে। মঙ্গলবার রাত ৯টায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে শেষ কথা বলেছে মহিমা। বাবা তার জন্য পছন্দের জামা ও চকোলেট কিনছে- সেগুলো দেখিয়েছেন। বুধবার ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু আর ফেরা হলো না।
নিহত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। এর আগে তিনি এশিয়ান টেলিভিশন, নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। কুষ্টিয়া শহরে সৎ ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন দেবাশীষ। বুধবার সকালে এ খবর কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মী সবাই ভিড় করেন তার বাসায়। অনেকে দেবাশীষের স্মৃতি মনে করে ডুকরে কেঁদে উঠেন।
স্ত্রী-পুত্রের চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন ভারত: স্ত্রী শারমিনের রক্তের কণিকা ভেঙে যেতো। তিন বছরের পুত্র স্বর্ণশীষের কণ্ঠে জড়তা ছিল। এ ছাড়া শ্বশুর আকরাম হোসেনও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। স্ত্রী, পুত্র ও শ্বশুরের উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩রা আগস্ট ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে যান দেবাশীষ। দেশে বাবা-মায়ের কাছে রেখে যান সাত বছরের কন্যা মহিমাকে। বেঙ্গালুরু পৌঁছে নারায়ণা হাসপাতালে সবার চিকিৎসা করান। দীর্ঘ ১৬ দিন ব্যাঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে গত ১৮ই আগস্ট মঙ্গলবার কলকাতায় ফেরেন। উঠেন কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে। কিন্তু মঙ্গলবারই দেবাশীষের দেশে ফেরার কথা ছিল। দেশে রেখে যাওয়া একমাত্র কন্যার জন্য কেনাকাটা করতে একদিন বেশি থাকেন। এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় দেবাশীষের।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত: রাতে কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়া শেষে হোটেলে নিজেদের রুমে ঘুমিয়ে পড়েন দেবাশীষ। মধ্যরাতে হঠাৎ ধোঁয়ায় পুরো হোটেল অন্ধকার হয়ে যায়। তখন পরিবার নিয়ে গভীর ঘুমে ছিলেন দেবাশীষ।
কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে শিখা ইন হোটেলে রাত ২টার দিকে আগুন লাগে। হোটেলের চার তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে হোটেলের এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণের কারণে আগুন ধরে যায়। এরপর কালো ধোঁয়ায় ঘিরে ফেলে পুরো হোটেল। আগুনে ৯ জনের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে সাংবাদিক দেবাশীষসহ তার পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তারা মারা যান বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কলকাতা পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আগুনের খবর পাওয়ার পর হোটেল প্রাঙ্গণ থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ৯ জন অচেতন অবস্থায় ছিলেন। যাদের মধ্যে দুইজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার দেবাশীষসহ নিহত পরিবারের সদস্যদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার তাদের মরদেহ দেশে আসার কথা রয়েছে।
ভালোবেসে আফসানাকে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ: দেবাশীষ দত্ত ও আফসানার ভালোবাসার গল্পটা ছিল স্বপ্নের মতো। দীর্ঘদিন একে অপরকে ভালোবেসে ৯ বছর আগে ঘর বেঁধেছিলেন তারা। দুজন দুই ধর্মের হলেও তা বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভালোবাসায় গড়া সেই সংসারে এসেছিল দুই সন্তান। একমাত্র ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত আর মেয়ে মহিমা দত্তকে ঘিরেই ছিল তাদের ছোট্ট পৃথিবী, ছিল হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু কলকাতার ভয়াবহ সেই আগুন মুহূর্তেই সবকিছু ছাই করে দিয়েছে। বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে মাত্র সাত বছরের মহিমা এখন পাথর হয়ে গেছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবা-মায়ের ছবির দিকে। ছবির মানুষগুলো যে আর কখনো ফিরে আসবে না, সেই নির্মম সত্যটি হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি ছোট্ট শিশুটি।
আমাদের এখন কে দেখবে: সাংবাদিক দেবাশীষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। ভিটেমাটি না থাকায় বাবা-মা আর পরিবার নিয়ে শহরের আড়ুয়াপাড়ার একটি ভাড়াবাসায় থাকতেন। বাবা দিলীপ কুমার দত্ত মানবজমিনকে বলেন, আমি হার্টের রোগী। আমার স্ত্রী অসুস্থ। কয়েকদিন আগে স্ট্রোক করেছে। প্রতি মাসে আমাদের ১০-১২ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। বাসাভাড়া, পরিবারের ভরণপোষণ ও আমাদের ওষুধের খরচ দেবাশীষই জোগাতো। এখন কে আমাদের দেখবে। কে দেবে বাসাভাড়ার টাকা, কে দেবে ওষুধের খরচ। নাতনি মহিমাকে কে দেখে রাখবে। তার পড়ালেখার খরচ কে দেবে। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি।
একদিন আগে আসেন দেবাশীষের ভায়রা: গত ৩রা আগস্ট চিকিৎসার জন্য দেবাশীষের সঙ্গে ভায়রা মিটুও গিয়েছিলেন ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে। চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার একসঙ্গেই তারা ফিরেছিলেন কলকাতায়। পরিবার নিয়ে দেবাশীষ হোটেলে উঠলেও ভায়রা মিটু হোটেলে উঠেননি। ব্যবসায় ব্যস্ততা থাকায় তিনি ওইদিনই দেশে ফিরে আসেন। এতে প্রাণে বেঁচে যান মিটু।
