হামলা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে। উচ্চস্বরে গান-বাজনা করাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসাছাত্ররা সেখানে হামলা চালিয়েছে। এতে পণ্ড হয়ে গেছে জেলা পুলিশ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং মাদ্রাসাছাত্রদের হামলায় দু’পক্ষের ৩০-৩৫ জন আহত হন। মঙ্গলবার রাতের এ ঘটনায় উত্তেজনা ছিল ভোর পর্যন্ত। হরতাল পালন করার ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ করতে শুরু করে মাদ্রাসাছাত্ররা। পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে উঠলে রাত ২টার দিকে মাদ্রাসায় গিয়ে আলোচনায় বসেন পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে মাদ্রাসাছাত্রদের উত্থাপিত সব দাবি মেনে নিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ভোর ৪টায় এ বৈঠক শেষ হয়। মাদ্রাসাছাত্রদের উত্থাপিত দাবি পুলিশ লাইন্সে আর গান-বাজনা করা যাবে না। সেটিও মেনে নেয়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। এছাড়া তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে এসব বিষয় নিয়ে ঘটনার পর থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ফোন ধরছেন না। অফিসে গিয়েও পাওয়া যায়নি জেলার পুলিশ কর্তাদের। পুলিশ, মাদ্রাসাছাত্র ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী সস্ত্রীক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফরে আসেন মঙ্গলবার। ডিআইজি পত্নী পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি পুনাক উপদেষ্টা সিদরাতুল মুনতাহার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আগমনকে কেন্দ্র করে পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে এদিন রাতে জেলা পুলিশ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে হামলা করে মাদ্রাসাছাত্ররা। এর আগেই ডিআইজি সেখান থেকে বেরিয়ে যান বলে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান। জাসাসের সহযোগিতায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি হচ্ছিল। এতে উচ্চস্বরে গান-বাজনা হওয়াতে পার্শ্ববর্তী দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে এসে প্রথমে উচ্চস্বর কমাতে বলে। এ নিয়ে পুলিশ ও মাদ্রাসাছাত্রদের মাঝে তর্কবিতর্ক হয়। দেখা দেয় উত্তেজনা।
একপর্যায়ে শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইন্সের ভেতরে প্রবেশ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা করে। বসার চেয়ার ছুড়ে ফেলে দেয়। সে সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে লাঠিচার্জ করে। মাদ্রাসাছাত্ররাও পাল্টা হামলা করে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও পুলিশের কয়েকজন সদস্যসহ ৩০-৩৫ জন আহত হন। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩১জন জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে। হামলার ভিডিও মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায় ড্রিল সেডের বসার চেয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। দারুল আরকাম মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, নর্তকি এনে সেখানে উচ্চস্বরে গান-বাজনা করা হচ্ছিলো। পরদিন বুধবার তাদের মাদ্রাসায় পরীক্ষা থাকায় গান-বাজনার উচ্চস্বরে তাদের সমস্যা হচ্ছিল। তাই প্রথমে তারা কয়েকজন পুলিশ লাইন্সের ভেতরে গিয়ে উচ্চস্বর কমানোর জন্য বলেন। প্রথমে উচ্চস্বর কমালেও পরে তারা আবারও উচ্চস্বরে বাড়িয়ে দেয়।
এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে মাদ্রাসার ছাত্রদের বাদানুবাদ শুরু হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছাত্রদের আহত করে বলে জানান তারা। মাদ্রাসাছাত্রদের আহতদের খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এরপরই রাত ২টায় জেলার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, ২ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে নিয়ে দারুল আরকাম মাদ্রাসায় গিয়ে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এ সময় জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সেখানে ছিলেন। বৈঠকে কাওমি ছাত্রঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সরাসরি মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্য এবং নির্দেশদাতাদের বিচার দাবি করা হয়। আহত মাদ্রাসাছাত্রদের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা পুলিশ, লাইনে আর কখনো কনসার্ট না করার অঙ্গীকার এবং পুলিশ সুপারকে পুরো ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হয়। দারুল আরকাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা। ছাত্রদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সব দাবি তারা মেনে নিয়েছেন।
বিশেষ করে যারা ছাত্রদের আহত করেছে ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বলে পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেছেন। জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কারা এ ঘটনার জন্য দায়ী তা নিরূপণ করা হবে। পুলিশের কারা বাড়াবাড়ি করেছে সেটিও দেখা যাবে ফুটেজে। পুলিশ সুপার শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বৈঠকে তার বক্তব্যে ঘটনাটি অনভিপ্রেত এবং ভুল বুঝাবুঝির কারণে ঘটেছে বলে জানিয়ে এবং এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। তিনি আরও বলেন, অসুস্থদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদ প্রশাসক সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরাও সহযোগিতা করবো।
সারাদিন ফোন ধরেননি জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা, দিন শেষে প্রেস বিজ্ঞপ্তি
পুলিশ লাইন্সে হামলার ঘটনার পর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপাররা সাংবাদিকদের ফোন ধরা থেকে বিরত থাকেন। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়েও খোঁজ করে পাওয়া যায়নি এই কর্মকর্তাদের। এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখেন তাদের অধীনস্থ অন্য কর্মকর্তারাও। দিনশেষে বুধবার বিকালে জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। পুলিশ লাইন্সের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জেলা পুলিশের বিবৃতি শিরোনামে ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে গতকাল (১৮ই আগস্ট) রাতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ লাইন্স গেটে এবং কম্পাউন্ড ডিউটিতে বিচ্যুতির অভিযোগে তিনজন পুলিশ সদস্যকে সকল ধরনের দায়িত্ব্ব থেকে প্রত্যাহার পূর্বক পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ)-কে প্রধান করে ৩ (তিন) সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ দায়িত্ব্ব পালনে শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একইসঙ্গে তদন্তাধীন বিষয়ে কোনো ধরনের অনুমাননির্ভর বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছিল না। মিডিয়া উইং, জেলা পুলিশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামে এটি দেয়া হয়। তবে মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উত্তম কুমার শর্মা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কথা স্বীকার করেন।
