আমার অফিস রুমে বসে ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম। বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার টেস্ট খেলা চলছিল। পাশে বসা সিনিয়র চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমান, রেজানুর রহমান, শামসুল হক, সুমন চিশতী সহ বেশ কয়েকজন। সকলেই
টেলিভিশনের দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় জয় পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। কাক্সিক্ষত জয় এলেই করতালিতে কেঁপে উঠলো অফিস কক্ষ। বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক জয় পেলো র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম থাকা দলের বিরুদ্ধে। সেটাও আবার তাদের দেশে। পরপরই খবরে দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেলোয়াড়দের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন। ছেলেদেরকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ক্রিকেটের এই জয় আমাদেরকে আনন্দিত করেছে। এরকম একটি জয় আমাদেরকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছিল ১৯৯৭ সালে। বাংলাদেশ যখন ১ম আইসিসি ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন হলো।
খেলোয়াড়েরা দেশে এলে রাজকীয় সম্মান দেয়া হলো। ফুলে ফুলে রংয়ে রংয়ে রঙিন হলো দেশ। এবারের জয়ে সেরকম কিছু ঘটবে না, তবে ক্রিকেট ইতিহাসে এটি লেখা থাকবে বাংলাদেশের নাম। ডারউইনের মাঠে যে ক’জন বাঙালি উপস্থিত থেকে যেভাবে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে জয়ধ্বনি দিচ্ছিলেন তাতে করে আমাদের বুক গর্বে ভরে উঠছিল। আমরাও যেন ডারউইনের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছি। এটাই তো দেশপ্রেম। দেশের প্রতি ভালোবাসা। ক্রিকেটে এরকম বিজয় আমাদের অনেকবারই এসেছে। ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড সহ অনেক দেশকেই পরাজিত করেছে আমাদের দামাল ছেলেরা। এই বিজয়ে পত্পত্ করে উড়েছে লাল-সবুজ পতাকা। এই যে, আমাদের এগারোজন খেলোয়াড় আঠারো কোটি মানুষকে আনন্দ দেয়, আমরা আনন্দিত হই, হাততালি দিই আবার কোনো জয়ের প্রত্যাশা করি। এই প্রত্যাশা সবসময়ই থাকে। খেলাতে যেমন আমরা উপভোগ করি তেমনি প্রতিটি কাজেই আমরা দেশকে রিপ্রেজেন্ট করি বিশ্বের কোথাও না কোথাও।
আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে ভেবে দেখলাম, মাঝে মাঝে আমরা কতো কিছুর ক্রাইসিস পার করি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিটি পাম্পে গাড়ির বিশাল লাইন। মানুষের ভেতর হতাশা। এই সংকট আমরা হয়তো কাটিয়ে উঠবো। কিন্তু আমরা যদি প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করি তাহলে তো এই সংকট মোকাবিলা করা কোনো ব্যাপারই না। ঢাকাতে তো যোগাযোগের বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। আমরা ইচ্ছা করলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে মেট্রোরেল সহ পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করতে পারি। তাহলে জ্বালানি সংকট কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব। আসলেই তো আমাদের গ্যাসের অতি মজুত নেই। বৈশ্বিক কারণে তেলেরও সংকট শুরু হয়েছে। এই সংকট কতো দীর্ঘ হবে সেটাও ভাববার বিষয়। আমাদের অনেকের তো গাড়ি আছে। সেই গাড়িতে যদি পাশের প্রতিবেশী বন্ধু কিংবা ভাইটিকে ড্রাইভ দিই তাতেও তো একটি গাড়ি কম ব্যবহৃত হবে। আমরা কি শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকবো? সরকারের একার পক্ষে কি এতকিছু মোকাবিলা করা সম্ভব? আঠারো কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে ছত্রিশ কোটি হাত। এতগুলো হাতকে যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে আমাদের কোনো সমস্যাকেই আর সমস্যা মনে হবে না। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে পারলে আমাদের এই দেশ তো কারও মুখাপেক্ষী থাকার কথা নয়। আমাদের সম্পদ আছে সেই সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। আবাসিক যে গ্যাস ব্যবহৃত হয় সেই গ্যাসের অপচয় দূর করা খুবই প্রয়োজন। অনেকেই সারাদিন চুলা জ্বালিয়ে রাখেন। মনে আছে ফজলে লোহানী তার ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্রও দেখিয়েছিলেন। যদিও এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সচেতন হয়েছে মানুষ; তারপরও অপচয় হচ্ছে। মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। সিলিন্ডার গ্যাস যেমন হিসাব করে ব্যবহার করা হয় সেভাবেই এই লাইনের গ্যাসও হিসাব করে ব্যবহার করলে যে মজুত আছে সেটা আরও অনেকদিন কাজে লাগানো যাবে। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে সেখান থেকে সঠিকভাবে উত্তোলন করতে পারলে আমাদের এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে। যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধ আমাদেরকে এক অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের আধিপত্য বিস্তার পুরো বিশ্বকেই সংকটে ফেলে দিয়েছে। অনেক দেশেই তেলের মজুত শেষ হয়ে আসছে। সেই তালিকায় আমরাও আছি। আমাদের সরকার গ্যাসের এই সংকটের কারণে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি করছে। ঢাকা শহরে নামবে ইলেকট্রিক বাস। এতে করে সাশ্রয় হবে জ্বালানি। তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরতা কমবে। ঢাকায় যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন তারা হয়তো একটু স্বস্তি পাবেন। শুধু সরকার নয়, আমরা প্রত্যেকেই সচেতন হয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি। সেটাই হবে দেশের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা। তাই যদি বলি আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে দেশের জন্য কাজ করবো যাতে মনে হবে সরকার আমাদেরকে নয় বরং আমরাই সরকারকে সহযোগিতা করছি।
