সৌদি আরব ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। স্কুলশিক্ষায় শান্তি ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর মনিটরিং পিস অ্যান্ড কালচারাল টলারেন্স ইন স্কুল এডুকেশন (ইমপ্যাক্ট-এস) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন মানবিকবিদ্যার বিষয়ে ব্যবহৃত ১৩৬টি পাঠ্যবই মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পাঠ্যক্রম দেশটির ‘ভিশন ২০৩০’-এর বৃহত্তর আধুনিকায়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এগোচ্ছে।
আগের বছরগুলোতে শুরু হওয়া পাঠ্যক্রমের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ শিক্ষাসামগ্রীতে মধ্যপন্থা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর আরও জোর দেয়া হয়েছে।
ইমপ্যাক্ট-এসের আগের পর্যালোচনায় সৌদি পাঠ্যবইয়ে যে ইহুদিবিদ্বেষী বিষয়বস্তুর কিছু উদাহরণ পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলোও এবার পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সপ্তম শ্রেণির ‘লাইফ অ্যান্ড ফ্যামিলি স্কিলস’ বইয়ের একটি হাদিসও বাদ দেয়া হয়েছে। ওই বর্ণনায় ইহুদি, খ্রিস্টান ও জরথুস্ত্রবাদীদের অনুসারীদের বিকলাঙ্গ প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ইহুদিরা নরকে যাবে- এমন শিক্ষা এবং ইহুদিদের প্রভাব অটোমান সাম্রাজ্যের পতনে ভূমিকা রেখেছিল- এমন বক্তব্যও পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় সহনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ সংস্করণগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ঐতিহাসিক সম্প্রদায়গুলোর প্রতি পাঠ্যবইয়ের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বইগুলোতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও উন্মুক্ত সংলাপকে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
দেশটির ইসলামি শিক্ষার পাঠ্যবইয়েও একই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিভিন্ন শান্তিচুক্তি ও সমঝোতার ঐতিহাসিক নজির তুলে ধরা হয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে তার করা শান্তিচুক্তি ও সমঝোতাগুলোকে সংঘাত নিরসন এবং সামাজিক সংহতির মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগের পাঠ্যবইয়ে শিয়া মুসলিম ও সুফিদের ‘অশুভ প্রকৃতির’ মানুষ বা মূর্তিপূজারী হিসেবে যে ধরনের বর্ণনা ছিল, তা পদ্ধতিগতভাবে বাদ দেয়া হয়েছে অথবা বিষয়টি হালকা করা হয়েছে।
প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাসসংক্রান্ত বিবরণেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে ইহুদিদের সমষ্টিগতভাবে প্রাথমিক মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করা হতো, সেসব অংশ পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোত্রের কর্মকাণ্ড হিসেবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা মুসলমানদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ- তারা ‘আল্লাহর শত্রু’ এমন যুক্তির ভিত্তিতে দেয়া আগের পাঠও বাদ দেওয়া হয়েছে।
জিহাদ ও সশস্ত্র সংঘাতের পাঠেও পরিবর্তন
বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে শান্তি, সহাবস্থান এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ওপর গুরুত্ব অব্যাহত রয়েছে বলে মূল্যায়নে বলা হয়েছে। জিহাদ ও সশস্ত্র সংঘাতসংক্রান্ত পাঠেও সহিংসতার মহিমান্বিতকরণ থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা গেছে।
একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রয়েছে। আইএসআইএস, আল-কায়েদা, হিজবুল্লাহ, হুতিদের পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডকেও সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের প্রচারক সংগঠন হিসেবে স্পষ্টভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঐতিহাসিক পাঠ্যগুলো থেকেও আরও কিছু আক্রমণাত্মক ভাষা বাদ দেয়া হয়েছে। যেমন, আগের সংস্করণে থাকা ‘মুসলমানরা জেরুজালেম ছেড়ে দেবে না’- এমন বক্তব্য পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়েছে,
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
