হ্যারি-মেগানের আকস্মিক বৃটেনে ফেরা ঘিরে তোলপাড়

সামনে ৫ বড় প্রশ্ন

হ্যারি-মেগানের আকস্মিক বৃটেনে ফেরা ঘিরে তোলপাড়

ফন্ট সাইজ:

ছয় বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর বৃটেনে ফিরছেন ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স- প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল। বৃহস্পতিবার বৃটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতাজুড়ে ছিল তাদের আকস্মিকভাবে দেশে ফেরার খবর।
হ্যারি-মেগান ও তাদের দুই সন্তান- ৭ বছর বয়সী প্রিন্স আর্চি এবং ৫ বছর বয়সী প্রিন্সেস লিলিবেট- লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকবেন। দুই সন্তানকেই ইতোমধ্যে ইংল্যান্ডের স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।
সাসেক্স দম্পতির এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন বৃটেনে নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে। বৃটিশ রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন বরাবরই দেশটির মানুষের ব্যাপক আগ্রহের বিষয়। ফলে হ্যারি-মেগানের ফিরে আসাকে ঘিরে এখন পাঁচটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এখনই কেন ফিরছেন?

কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের বৃটেনে ফেরার কথা থাকায় সিদ্ধান্তটি হঠাৎ মনে হলেও, ধারণা করা হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে তারা বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়তো সাম্প্রতিক সময়েই নেয়া হয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বৃটেনে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ায় সন্তানদের নিয়ে দ্রুত সেখানে স্থায়ী হওয়ার প্রয়োজনও থাকতে পারে।
গত মাসে রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎও এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইংল্যান্ডের গ্লুচেস্টারশায়ারে রাজার ব্যক্তিগত বাসভবন হাইগ্রোভে ওই সাক্ষাৎ হয়। ৭৭ বছর বয়সী রাজা চার্লস চার বছর পর প্রথমবারের মতো তার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করেন।

জুলাইয়ের শেষ দিকে হ্যারির বৃটেন সফরের সময় মেগান ও সন্তানরাও সেখানে যান। হ্যারির সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী বছরের ইনভিক্টাস গেমস নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়া।
সফরে তারা হ্যারির মা প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার পারিবারিক সম্পত্তি আলথর্প হাউসেও যান। সেখানেই ডায়ানাকে সমাহিত করা হয়েছে।

তারা কেন বৃটেনে ফিরছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে দম্পতির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র শুধু জানিয়েছে, গত মাসে পুরো পরিবার মিলে বৃটেনে সময় কাটিয়ে তারা খুবই আনন্দ পেয়েছিলেন।

নিরাপত্তার কী হবে?

পরিবারটির বৃটেনে ফেরার খবর প্রকাশের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়- তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? বৃটেনে অবস্থানের সময় করদাতাদের অর্থে পুলিশি নিরাপত্তা পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কারণ।

এমনকি গত মাসে হ্যারি লন্ডনে কয়েকটি কর্মসূচিতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আসার পরিকল্পনাও শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছিলেন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে।

বৃটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার তালিকায় বর্তমানে পঞ্চম স্থানে থাকা হ্যারি রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তার নিরাপত্তা কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বৃটিশ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জড়িয়েছেন। রয়্যাল অ্যান্ড ভিআইপি এক্সিকিউটিভ কমিটি বা র‌্যাভেক তার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পর থেকেই এ নিয়ে বিরোধ চলছে।

গত বছর বিবিসিকে হ্যারি বলেছিলেন, এই মুহূর্তে আমি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি না, যেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের বৃটেনে ফিরিয়ে আনব। ওই মন্তব্যের সময় তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হোম অফিসের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে হেরে গিয়েছিলেন।

জুনের শেষ দিকেও তার নিরাপত্তা নিয়ে র‌্যাভেকের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের পর্যালোচনার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। এখনও স্পষ্ট নয়, হ্যারি ও বৃটিশ সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কিনা। তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় খরচ কে বহন করবে, সেটিও অজানা।
বৃটিশ সরকারের এক মুখপাত্র অবশ্য আগে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে “কঠোর ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ” বলে বর্ণনা করেছিলেন।

রাজপরিবারের সঙ্গে কি বরফ গলবে?

হ্যারি-মেগানের সঙ্গে বৃটিশ রাজপরিবারের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই তিক্ত। ২০২০ সালে তারা বৃটেন ছেড়ে রাজপরিবারের কর্মরত সদস্যের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজাত উপকূলীয় এলাকা মন্টেসিটোতে বসতি গড়েন।
ওপ্রা উইনফ্রের সঙ্গে তাদের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার, নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র এবং হ্যারির আত্মজীবনী প্রকাশের পর রাজপরিবারের সঙ্গে দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

সিএনএন জানতে পেরেছে, হ্যারি-মেগানের বৃটেনে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা রাজা চার্লসকে গত সপ্তাহান্তে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহ আগে বাবার সঙ্গে হ্যারির সাক্ষাতের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজা চার্লস নাকি সাসেক্স পরিবারের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর সুযোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাবা-ছেলের সম্পর্কে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। চার্লসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর হ্যারি দ্রুত বৃটেনে ছুটে এসেছিলেন। বর্তমানে তাদের মধ্যে আগের তুলনায় বেশি নিয়মিত যোগাযোগ হয় বলেও জানা গেছে।

তবে হ্যারির বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কের তেমন উন্নতি হয়নি। উইলিয়াম ও তার স্ত্রী ক্যাথরিনকেও হ্যারি-মেগানের ফিরে আসার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রিন্স বা প্রিন্সেস অব ওয়েলসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

একসময় বৃটিশ সংবাদমাধ্যম যাদের ‘ফ্যাব ফোর’ নামে অভিহিত করেছিল- হ্যারি, মেগান, উইলিয়াম ও ক্যাথরিন- তাদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ২০২২ সালে উইন্ডসরে।
এর এক বছর আগে ডায়ানার ৬০তম জন্মবার্ষিকীতে তার স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভও দুই ভাই একসঙ্গে উন্মোচন করেছিলেন। আগামী বছর ডায়ানার মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হবে। তার আগে দুই ভাই তাদের পুরোনো মতবিরোধ ভুলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবেন কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কোথায় থাকবেন হ্যারি-মেগান?

এখন পর্যন্ত শুধু জানা গেছে, তাদের নতুন বাসস্থান লন্ডনে হবে না। এর বাইরে ঠিক কোথায় তারা থাকবেন, তা প্রকাশ করা হয়নি। তাদের মর্যাদা ও রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যথেষ্ট নিরাপদ কোনো বাড়িতেই তারা বসবাস করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হ্যারির মা ডায়ানার পরিবারের সঙ্গে সাসেক্স দম্পতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই তারা নর্দাম্পটনশায়ারে অবস্থিত স্পেন্সার পরিবারের সম্পত্তির কাছাকাছি থাকতে পারেন। আরেকটি সম্ভাব্য জায়গা হতে পারে ইংল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলের অভিজাত ও গ্রামীণ এলাকা কটসওল্ডস।

বৃটেনে তাদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও রয়েছেন, যাদের অনেকেরই পরিবার ও সন্তান রয়েছে। ফলে বন্ধুদের কাছাকাছি স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারেন।

বৃটেনে ফিরে কী করবেন তারা?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বৃটেনে ফিরলেও হ্যারি ও মেগান আগের মতো কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন না। রাজপ্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরেই স্পষ্ট করে আসছে, তাদের প্রস্তাবিত ‘হাফ ইন, হাফ আউট’ অর্থাৎ আংশিকভাবে রাজকীয় দায়িত্ব পালন এবং আংশিকভাবে স্বাধীন জীবনযাপনের ব্যবস্থা কার্যকর নয়।

তাই বৃটেনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও তাদের কোনো সরকারি রাজকীয় দায়িত্ব পাওয়ার কথা নয়। তবে তাদের ফিরে আসার পর বৃটিশদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে পারে- ভবিষ্যতে কি সেই অবস্থান বদলাবে?
কারণ ছয় বছর আগে তাদের রাজপরিবার ছাড়ার ঘটনাকে রাজতন্ত্রের জন্য একটি বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতার কারণে হ্যারি-মেগানের জনপ্রিয়তা ছিল।

তারা এখন নিজেদের দাতব্য কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বেশি মনোযোগ দেবেন। হ্যারির আগামী মাসেই বৃটেনে আসার কথা রয়েছে। গুরুতর অসুস্থ শিশু ও তরুণদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা ওয়েলচাইল্ডের একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেবেন।

এ ছাড়া আগামী বছর বার্মিংহামে অনুষ্ঠিতব্য ইনভিক্টাস গেমস নিয়েও তিনি ব্যস্ত থাকবেন। অন্যদিকে মেগানের ‘অ্যাস এভার’ লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড রয়েছে, যা তিনি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আরও সম্প্রসারণ করতে চাইবেন।

তবে রাজপরিবার ও সাসেক্স দম্পতি ভবিষ্যতে বিভিন্ন কর্মসূচি কতটা সমন্বয় করে পরিচালনা করবেন, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। একই সময়ে একাধিক রাজপরিবারের সদস্য একই ধরনের জনকল্যাণমূলক বিষয়ে কাজ করলে জনসাধারণের মনোযোগ ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, রাজা চার্লস ও প্রিন্স উইলিয়াম ব্যক্তিগত পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে হ্যারি-মেগানকে কতটা যুক্ত করবেন। ইস্টারে উইন্ডসরে পারিবারিক আয়োজন কিংবা স্যান্ড্রিংহামে বড়দিনের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে কিনা, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে।

হ্যারি-মেগান আর কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য না হলেও তারা রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার ওপর বৃটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার তালিকায় হ্যারির অবস্থান এখনো বহাল রয়েছে।