সিডনিতে বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাস

অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে ইতিহাস

সিডনিতে বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাস

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনের ক্রিকেট মাঠে তখন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। আর প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে সিডনিতে বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছিলেন সেই একটি মুহূর্তের জন্য—বাংলাদেশ জিতেছে! মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন, কেউ ফোন করেন স্বজন ও বন্ধুদের। আবার কেউ বাংলাদেশের পতাকা হাতে ছুটে যান পরিচিত আড্ডাস্থলে।

সিডনির বাংলাদেশি অধ্যুষিত লাকেম্বায় শুরু হয় আনন্দ ভাগাভাগি। আর অনেকের ঘর হয়ে ওঠে ছোট্ট একেকটি উদযাপনস্থল। ডারউইনে সরাসরি মাঠে বসে বাংলাদেশের খেলা দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক প্রবাসীর। কিন্তু দূরত্ব, সময় ও নানা ব্যস্ততার কারণে সবার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই টেলিভিশন, মোবাইল কিংবা অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের পর্দায় চোখ রেখেই তারা অনুসরণ করেছেন বাংলাদেশের প্রতিটি বল, রান এবং উইকেট। শেষ পর্যন্ত যখন বাংলাদেশের জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, তখন আর ঘরে বসে থাকা যায়নি।

‘মনে হচ্ছিল আমরাই ডারউইনে আছি’

সিডনির বসবাসকারী হৃদয় নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি বলছিলেন, ‘ডারউইনে যেতে না পারার আক্ষেপটা বাংলাদেশের জয় অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। খেলা দেখতে ডারউইনে যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। যেতে পারিনি। কিন্তু বাংলাদেশ জেতার পর মনে হলো, আমরা যেন সবাই ডারউইনেই ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে আনন্দ করছি, ফোনে সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি—এটা সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি।’

সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মেহেদি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় বসে বাংলাদেশের এমন ঐতিহাসিক জয় দেখা সত্যিই গর্বের মুহূর্ত। ডারউইনে গিয়ে খেলা দেখতে পারিনি, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে বসে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছি। বাংলাদেশ যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেছে, তাতে আমরা ভীষণ আনন্দিত ও গর্বিত। এই জয় আমাদের মতো প্রবাসী শিক্ষার্থীদের দেশকে আরও বেশি মনে করিয়ে দিয়েছে।’

শুধু ম্যাচ দেখা নয়, জয় উদযাপনকে কেন্দ্র করে অনেক বাসায় আয়োজন করা হয় পার্টির। পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতদের নিয়ে চলে খাবার-আড্ডা। কারো হাতে বাংলাদেশের পতাকা, কারো গায়ে লাল-সবুজের জার্সি। ক্রিকেটের জয় মুহূর্তেই পরিণত হয় প্রবাসীদের মিলনমেলায়।

লাকেম্বায় লাল-সবুজের উচ্ছ্বাস

সিডনির বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম পরিচিত এলাকা লাকেম্বাতেও দেখা যায় আনন্দের ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশের জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রবাসীরা একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে সেখানে জড়ো হন। কারো মুখে বিজয়ের হাসি, কারও কণ্ঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রশংসা। কেউ ম্যাচের সেরা মুহূর্ত নিয়ে আলোচনা করছেন, কেউ আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। মনে হচ্ছিল, সিডনি নয়—লাকেম্বার কোনো এক কোণে যেন বাংলাদেশেরই একটি ছোট্ট উৎসব বসেছে।

অস্ট্রেলিয়ানদের মুখেও বাংলাদেশের প্রশংসা

বাংলাদেশিদের আনন্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট প্রেমীদের প্রশংসাও। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী ক্রিকেট দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ অনেক অস্ট্রেলিয়ানই স্বীকার করছেন—বাংলাদেশ দল এবার সত্যিই ভালো ক্রিকেট খেলেছে।

অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ডেবিট বলেন, ‘বাংলাদেশ দারুণ ক্রিকেট খেলেছে। পুরো ম্যাচেই তারা অস্ট্রেলিয়ার ওপর আধিপত্য দেখিয়েছে। সত্যি বলতে, বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়া একেবারেই বিধ্বস্ত হয়েছে। এই জয় বাংলাদেশের প্রাপ্য।’

স্মিথ নামের এক ব্যাক্তি বলেন, ‘বাংলাদেশকে আজ সত্যিই অসাধারণ মনে হয়েছে। তাদের ব্যাটিং, বোলিং ও আত্মবিশ্বাস, সবকিছুই ছিল দুর্দান্ত। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারেনি, আর বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশের এই জয় অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।’

প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বিষয়টি আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ প্রিয় দলের জয় শুধু নিজেরাই উদযাপন করছেন না, স্বাগতিক দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছ থেকেও পাচ্ছেন সম্মান ও স্বীকৃতি।

একটি জয়, অনেক আবেগ

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নতুন কিছু নয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়—প্রবাসীদের কাছে এর আবেগ আলাদা। দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও বাংলাদেশের ক্রিকেট তাদের দেশের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ক্রিকেটের একটি জয় তাই শুধু স্কোরবোর্ডের হিসাব নয়, এটি প্রবাসীদের কাছে দেশকে কাছে পাওয়ার একটি উপলক্ষ। ডারউইনের মাঠে বাংলাদেশ পেয়েছে ঐতিহাসিক জয়। আর সেই জয়ের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে সিডনির লাকেম্বায়, প্রবাসীদের ঘরে ঘরে, বন্ধুদের আড্ডায়।

ডারউইনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ—আর সিডনিতে সেই জয়ের আনন্দে প্রবাসীরা খুঁজে নিয়েছেন এক টুকরো বাংলাদেশ।