আরেক রকম যোদ্ধা

আরেক রকম যোদ্ধা

ফন্ট সাইজ:

আমরা খুব পরিশ্রমী জাতি। এ কথা বিশ্বব্যাপী সকলেই জানে। আমরা শারীরিক পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত। আমাদের দেশের আবহাওয়া না অতি গরম, না অতি ঠান্ডা। অল্প ঘাম হবে। অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয় না। এইসব অতিক্রম করেই আমাদের দেশের মানুষ কাজ করে। কিছুদিন আগে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম, যে একটি পহাড়ি এলাকায় একজন লোক ফ্রিজ নিয়ে পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে। লোকটাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল তার নাম আবদুর রহিম। সে শরীয়তপুর জেলার মানুষ। এখানে এসে পাহাড়ে পাহাড়ে ফ্রিজ উঠায় আবার পাহাড় থেকে ফ্রিজ নামায়। আমি অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ফ্রিজের মতো একটা ভারী জিনিস পিঠে বেঁধে সমতল রাস্তা দিয়েই হাঁটা মুশকিল সেখানে সে এত উঁচু পাহাড়ে উঠছে আবার নামছে।

বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে অনেক পরিশ্রম করছে। পরিশ্রমের কারণে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনছে। ঘামে জবজবে শরীর। রুক্ষ্ম মুখ। এই বাংলাদেশের মানুষ সারা দিন রিকশা চালায় রোদ নেই বৃষ্টি নেই শরীরে উপর দিয়ে সব বয়ে যায়। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে পরিশ্রমের ছাপ কিন্তু কাজ থেমে থাকবে না। এই যে সৌদি আরবে একটি সোফা কারখানায় আগুন লেগে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মারা গেল। থেমে গেল তাদের রেমিটেন্স। তবুও মানুষ থেমে থাকে না। বিদেশে তাদের কর্ম চলতেই থাকে।

কনস্ট্রাকশন কাজেও তেমনি অভূতপুর্ব সাফল্য নিয়ে এসেছে। এরা মাথায় ইটের ঝাঁকা নিয়ে ছয়-সাততলা উঠে যায়। এখন অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এসব কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। তবে এই নির্মাণ শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। এদের পরিশ্রম অকল্পনীয়। আমাদের দেশের নারী-পুরুষ গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বের পোশাক শিল্পে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। আমাদের পোশাক শিল্প সারা বিশ্বে রপ্তানি হচ্ছে। এর থেকে আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি। পোশাক শিল্পে এখনো বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। এই পোশাক শিল্পের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে এদের শ্রম। তবে এই শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন কি আমরা করতে পেরেছি? এদের শ্রমের সঠিক মূল্য কি দিতে পেরেছি? এসব বিষয়ে ভাবতে হবে মালিক পক্ষকে। শ্রমিকদের সঠিক পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

এই বাংলার মানুষ ওলন্দাজ, ডাচ্‌, ইংরেজদের হটিয়েছে। মোগলদের পরাজিত করেছে। সবশেষে একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছে। আবার চব্বিশে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। পৃথিবীর কম দেশই স্বাধীন হয়েছে যুদ্ধ করে। কাতালানরা কত বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন করতে পারছে না। আমার জানা নেই যুদ্ধ করে কতটি দেশ স্বাধীন হয়েছে। যেমন স্পেনের কাছ থেকে কাতালানরা স্বাধীনতা আনতে পারেনি। তারা যা পারেনি আমরা সেটা পেরেছি। বাঙালির অদম্য সাহস আর পরিশ্রমের কারণে। এসবই হয়েছে এদের মানুষের পরিশ্রমী মনোভাবের ফলে। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

যারা কৃষি কাজ করেন তারা সেই ভোর থেকে সারাদিন রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পরিশ্রম করে আমাদের কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমরা যারা শহরে থাকি তারা এইসব কৃষকের পরিশ্রমের ফসলে খেয়ে উদরপূর্তি করি। রুক্ষ্ম মাটির ভেতর থেকে প্রাণের সঞ্চার করেন তারা। ধানগাছ যখন লকলক করে বড় হয় কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। তার হৃদয়ে বিজয়ের আনন্দ। তার যে অমানবিক পরিশ্রমের কথা কি আমরা ভাতের দানা খেতে খেতে তাদের সেই শ্রমের কথা কি ভেবে দেখেছি। আমাদের প্রবাসীরা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা সহ নানান দেশে। এই প্রবাসীদের আমরা বলি রেমিটেন্স যোদ্ধা। এইসব রেমিটেন্স যোদ্ধা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। দেশের রিজার্ভে এই রেমিটেন্স যোদ্ধারা যে অবদান রাখছে সেটা আমাদের দেশের জন্য বিশাল।

আমরা স্বপ্ন দেখি আগামীর বাংলাদেশ হবে উন্নত এক বাংলাদেশ। সেইজন্য যে পরিশ্রম করতে হবে সেই পরিশ্রম করতে আমাদের দেশের মানুষেরা প্রস্তুত। শুধু সুযোগ পেলেই তারা এদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটাই আমাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। এই যে কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ আমরা সকলে মিলেই আমাদের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো আর কণ্ঠে গেয়ে উঠবো আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।