রাজনীতির মাঠ থেকে বঙ্গভবনে পা রাখতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিক্ষকতা, রাজনীতির বর্ণিল অধ্যায় পার করে হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট। শুরু হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। রাজনীতির মাঠে ত্যাগ আর বিশ্বস্ততার প্রতিদান হিসেবে দুঃসময়ের সৈনিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রেসিডেন্ট পদে দলের প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে বিএনপি। গতকাল দুপুরে দলের এই সিদ্ধান্ত জানান- বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে দলীয় মনোনয়নপত্র তুলে দেন তিনি। গতকালই নির্বাচন কমিশনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়। এ পদে বিরোধী দলের প্রার্থী করা হয়েছে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অব. অলি আহমেদ বীরবিক্রমকে।
জাতীয় সংসদে বিএনপি’র নিরষ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই যে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন- এটি নিশ্চিত হয়েছে দলীয় মনোনয়নের মধ্য দিয়ে। টানা ১৬ বছর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। এই সময়ে মামলা, হামলা ও কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বার বার। নানামুখী নিপীড়নের মধ্যেও তিনি দলের কঠিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ক্লিন ইমেজ, সজ্জন ভাবমূর্তির কারণে সর্বমহলে সমাদৃত মির্জা ফখরুল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অনন্য চরিত্র। বর্ণিল জীবনের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্মজীবনে ছিলেন শিক্ষক পরে রাজনীতি তার পেশা আর নেশা। কর্মী থেকে নেতা, পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুরু, সেখান থেকে সংসদ সদস্য- বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশের প্রেসিডেন্টের আসনে বসার অপেক্ষা।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কক্ষে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকের শুরুতে তার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়নের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এ সময়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুভেচ্ছা জানান। এই বৈঠকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, চিফ হুইপ, হুইপরা উপস্থিত ছিলেন। ওদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপি’র নেতারা। গতকাল বিএনপি’র পক্ষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার মনোনয়নপত্র জমা দেন।
বৈঠক চলার মধ্যে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি’র পক্ষ থেকে আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রিজভী বলেন, একই সঙ্গে তিনি প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি’র মহাসচিব পদ এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে পদত্যাগ করেছেন। মহাসচিবের শূন্য পদে কে আসছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তার কাছে দায়িত্ব দেয়া আছে, যে প্রক্রিয়ায় যেভাবে হোক তিনি সেটা মতামত নিয়ে জানাবেন। এখন শুধু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রেসিডেন্ট করার কথা আমরা জানালাম।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন: প্রাথমিক থেকে কৃতী ছাত্র ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁও প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্র জীবনে পড়ালেখার পাশাপাশি রাজনীতির হাতেখড়ি। মেধাবী ছাত্র হয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেনও তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার পাশাপাশি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। ছিলেন এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকও। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কর্মজীবন ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জিতে হন চেয়ারম্যান। মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী সভার সদস্য ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপের মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি’র সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে ওঠে আসেন তিনি। ২০১১ সাল থেকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপি’র ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। সেই থেকে বিএনপি’র মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।
রাজনীতির মাঠের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রা পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পট পরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের শাসনের সময় বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি’র সংকটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন পরীক্ষিত এক সৈনিক।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ধেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারা দেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ নিয়ে সংসার। স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
