মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থিরতার আগুনে জ্বলছে। ইরান ও ইসরাইল–এর সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত উত্তেজনার খবর নয়; এটি সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থান, প্রক্সি শক্তির সক্রিয়তা এবং পারমাণবিক আশঙ্কার সমান্তরাল বাস্তবতা। একই সময়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা চাপে দিশেহারা; আন্তর্জাতিক স্থবিরতায় বিচ্ছিন্নতার বোঝা বইছে।
এই অস্থিরতার ঢেউ শুধু তেহরান বা তেলআবিবে আছড়ে পড়ছে না; এর প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে ঢাকা, ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদ, কাবুল সবখানেই। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, কূটনৈতিক সমীকরণ ও নিরাপত্তা কাঠামো সবই নতুন করে পুনর্বিন্যাসের পথে।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এই মুহূর্তটি নিছক আন্তর্জাতিক খবর নয়; এটি এক কঠিন বাস্তব পরীক্ষা। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এই যখন প্রধান অগ্রাধিকার, তখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, শিপিং খরচ বাড়বে, শিল্প উৎপাদনে চাপ পড়বে। বৈদেশিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রপ্তানি খাতও ধাক্কা খেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান কেন্দ্র। লক্ষাধিক শ্রমিকের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। যুদ্ধ যদি বিস্তৃত হয় বা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে, তবে কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হবে। একটি মানবিক সংকট দ্রুত অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। বাংলাদেশ বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রায়শই বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের কৌশলগত অবস্থান, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের আবেগ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। সামান্য কূটনৈতিক ভুলও বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপত্তা ঝুঁকিও উপেক্ষা করার নয়। আন্তর্জাতিক সংঘাত অনেক সময় অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক উত্তেজনাকে উসকে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বৈশ্বিক ঘটনা মুহূর্তেই দেশের ভেতরে আলোড়ন তোলে। ফলে সরকারকে শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চেই নয়, অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি রক্ষাতেও বিচক্ষণ হতে হবে।
তবে সংকটের ভেতরেও সম্ভাবনা থাকে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে বাংলাদেশ বিকল্প উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে পারে। জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি বজায় রাখা। জ্বালানি আমদানি, প্রবাসী আয়ের উৎস, এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক সবই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে একতরফা অবস্থান নেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নীরব কূটনীতিও সব সময় কার্যকর নয়। প্রয়োজন বাস্তববাদী, অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক এবং মানবিক মূল্যবোধসম্মত পররাষ্ট্রনীতি।
অতএব, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত কেবল আঞ্চলিক শক্তির লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য বার্তা স্পষ্ট অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ করতে হবে এবং কূটনীতিতে কৌশলী নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। অগ্নিগর্ভ এই সময়ে আবেগ নয়, প্রজ্ঞাই হতে পারে টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]
অগ্নিঝরা মধ্যপ্রাচ্য, কঠিন সমীকরণে বাংলাদেশ
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
১ মার্চ (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ১০ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
