ওবায়দুল কাদেরের মামলায় সমাপনী যুক্তিতর্ক আজ ছাত্রলীগকে ‘মারো না কেন’ বলে উস্কানি দেয়া হয়

ফন্ট সাইজ:

ছাত্রলীগকে ভালো উপদেশ দিয়েও থামানো যায় না, সেখানে ওবায়দুল কাদের মারো না কেন বলে এমন উস্কানিমূলক নির্দেশ দিয়েছেন। এরই ফলে জুলাই-আগস্ট জুড়ে এই ম্যাসাকার চললো বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আগুনে ঘি ঢাললো। মঙ্গলবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পঞ্চম দিনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে মামলার সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে।

এদিন প্রসসিকিউশন তাদের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পরে আসামিপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরবেন। এ মামলায় ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাড়াও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও ওয়ালি আসিফ ইনানকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা সবাই পলাতক রয়েছেন।
গতকাল, প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম মামলার যুক্তিতর্ক তুলে ধারেন। এ সময় জুলাই আন্দোলনের কয়েকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন ও কল রেকর্ড বাজিয়ে শোনানো হয়। যুক্তিতর্কে জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক হারে মারণাস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশন জানায়, জাতিসংঘের ও পুলিশের আলাদা প্রতিবেদনেই ৭.৬২ মিলিমিটার অ্যামুনিশন ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে। এ ছাড়া আন্দোলন দমনে মিলিটারি রাইফেল ৬৬%, শটগান ৪২%, পিস্তল ২% এবং অন্যান্য অস্ত্র ২০% ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউশন জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলি ও হত্যার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা হিসেবে আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাদের অধস্তন নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। তাদের নির্দেশনা সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে যায় এবং বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য, যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন সময়ে বক্তৃতা ও বিবৃতির মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণে উৎসাহিত ও উস্কানি দেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের বক্তব্য ও অন্যান্য নথিপত্র ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে শেখ ফজলে শামস পরশের একটি কথোপকথনের কথাও তুলে ধরে প্রসিকিউশন। সেখানে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা গ্রহণের পর পরশ তার সংগঠনের নেতাকর্মীদের ফোন করে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার নির্দেশনা দেন বলে দাবি করা হয়। একইভাবে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই কথোপকথনে সাদ্দাম রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন মোকাবিলার বিষয়ে প্রস্তুতির কথা জানান। পরদিন ১৪ই জুলাই সাদ্দাম হোসেনের ‘ছাত্রলীগ প্রস্তুত’, ‘ছাত্রলীগ দেখে নেবে’ এবং ‘এর শেষ দেখে ছাড়বে’ এ ধরনের বক্তব্যের বিষয়েও ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করা হয়। প্রসিকিউশন আরও দাবি করে, এসব ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে দেয়া নির্দেশনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাইয়ের হামলার প্রসঙ্গ তুলে প্রসিকিউশন জানায়, সেদিন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র হামলা চালায়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও একই ধরনের হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এসব অভিযোগের পক্ষে নথি, সাক্ষ্য এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানায় প্রসিকিউশন।

পুলিশের প্রতিবেদনেই ৭.৬২ মিলিমিটার অ্যামুনিশন ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে: যুক্তিতর্কে জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক হারে মারণাস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশন জানায়, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ও পুলিশের প্রতিবেদনেই ৭.৬২ মিলিমিটার অ্যামুনিশন ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে। পুলিশের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হয়েছিল বলে জানান প্রসিকিউটর তামিম। এসব অস্ত্র সিভিলিয়ানের কেনার সামর্থ্য নাই বলে জানান তিনি। প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলনে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার অ্যামুনিশন ব্যাপকভাবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ধরনের গুলি সাধারণত অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় তিন লাখের বেশি গুলি ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫ হাজারের বেশি গুলি শুধু ঢাকা শহরেই ব্যবহৃত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়। দেশের অন্তত ৪০টি জেলায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া প্রায় ৫০টি জেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতা ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ ছিল এটি প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানায়।

শিশু হত্যা ও হাসপাতালে হামলার অভিযোগ: জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতার ভয়াবহতার বিভিন্ন দৃষ্টান্তও যুক্তিতর্কে তুলে ধরে প্রসিকিউশন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন, শহীদদের সরকারি গেজেটসহ বিভিন্ন নথি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ছিল। প্রায় ১২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২০০ শিশুকে হত্যার অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়। এমনকি ভবনের ছাদে অবস্থানরত শিশুদেরও গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া হেলিকপ্টার থেকে গুলি, হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেয়া, লাশ টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নেয়া এবং জীবিত অবস্থায় এপিসি থেকে ফেলে দেয়ার মতো ঘটনার কথাও যুক্তিতর্কে উল্লেখ করা হয়। ইয়ামিন নামের এক আন্দোলনকারীকে জীবিত অবস্থায় এপিসি থেকে ফেলে দেয়ার ঘটনাও প্রসিকিউশন তুলে ধরে। প্রসিকিউশন আরও অভিযোগ করে, আহতরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে সেখানেও হামলা চালানো হয়েছে এবং অনেককে চিকিৎসা নিতে দেয়া হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ২০/২৫ জন লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ করে পরে আনসার সদস্যরা মাইকিং করে তাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দিয়ে গেট বন্ধ করে দেয়া হয় বলে জানান এই প্রসিকিউটর।