তীব্র তাপমাত্রায় বাড়তি খরচের চাপে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা

তীব্র তাপমাত্রায় বাড়তি খরচের চাপে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে তাপমাত্রা। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। গরমের তীব্রতা বাড়তেই পোশাক শ্রমিক নাসরিন বেগম (৩২)কে নিজের শরীর সচল রাখতে বেছে নিতে হয় খাবার স্যালাইন, লেবু ও ডাব। গাজীপুরের কোনাবাড়ীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করা নাসরিনের ১৪,০০০ টাকা মূল্যের মূল বেতনের মধ্যে মাসে ১,০০০ টাকারও বেশি চলে যায় কেবল এই তাপদাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে। এই অতিরিক্ত খরচ তার সীমিত আয়ের ওপর এক বড় বোঝা।

শ্রমিকরা চরম দাবদাহের কবলে পড়ে এভাবেই নিজেদের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিশ্বব্যাপী গড়ের (০.৮ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) চেয়ে কিছুটা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার মাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা বেশি থাকায় উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে আরও ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আউটডোর ও শিল্পকারখানার শ্রমিকদের তাপজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘পিপলস কারেজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিকরা অতিরিক্ত এই গরম সহ্য করতে যে অপ্রকাশিত খরচের সম্মুখীন হচ্ছেন, তা একপ্রকার ‘হিট ট্যাক্স’ বা ‘তাপ কর’। কারখানায় ফ্যান ও এক্সস্ট চললেও ভেতরে তাপমাত্রা নিয়মিত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ফলে কাজের ফাঁকে বারবার মুখ-হাত ধুতে বাধ্য হন শ্রমিকরা। এমনকি কর্মঘণ্টা শেষে ঘরে ফিরেও নিস্তার মিলছে না। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গাজীপুর এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভূমির তাপমাত্রা ২.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং তপ্ত মেঝে থেকে তাপ বিকিরণের ফলে শ্রমিকরা পর্যাপ্ত ঘুমাতে ও ক্লান্তি দূর করতে পারছেন না।

তদুপরি, সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম ১৬ ভাগের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়েছে। গরমের এই ক্ষতিকর প্রভাব নারী শ্রমিক ও অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের দিনে জন্ম নেয়া শিশুরা হিট স্ট্রোক, খিঁচুনি বা মাথাব্যথার ঝুঁকিতে থাকে এবং তাদের জন্মকালীন শারীরিক জটিলতা ১৪ ভাগ বৃদ্ধি পায়। অসুস্থতার কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকলে বা হাফ-ডে ছুটি নিলে শ্রমিকদের বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়। প্রতিদিন শুধু গরমের হাত থেকে বাঁচতে এবং শরীর চাঙ্গা রাখতে শ্রমিকরা আখের রস, ঠাণ্ডা পানীয়, ওষুধ ও খাবার স্যালাইন কিনে মাসে গড়ে ১,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ করছেন। অন্যদিকে কারখানা মালিকরাও এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আর্থিক চাপে পড়ছেন। ‘অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউট’-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি খরচের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পোশাক কোম্পানির মুনাফা ৩৪ ভাগ পর্যন্ত কমতে পারে।

গাজীপুরের ‘ডেনিম এক্সপার্ট লি.’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, শ্রমিকদের পানীয় জল, অতিরিক্ত বাতাস, স্যালাইন ও ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা করায় এবং বিদ্যুৎ ও জেনারেটরের জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারখানার পরিচালন ব্যয় প্রায় ২ থেকে ৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারখানার উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের দাবি জানান তিনি। এই ক্রমবর্ধমান উত্তাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মূল ভুক্তভোগী হলো শ্রমিকগণ। দিনশেষে ‘অদৃশ্য মূল্য’ গুনতে হচ্ছে সকল সাধারণ পোশাক শ্রমিকদেরই, যাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে ঘুরছে দেশের অর্থনীতির চাকা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন