নাশকতার শঙ্কা সতর্কতা

নাশকতার শঙ্কা সতর্কতা

ফন্ট সাইজ:

৫ই আগস্ট ঘিরে দেশ জুড়ে নাশকতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চোরাগোপ্তা হামলা, বোমাবাজি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনেও হামলার শঙ্কা করা হচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। নাশকতার আলামতও বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে নাশকতাকারীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার জানান দিয়েছে। কথিত আছে- নাশকতাকারীরা ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে বড় হামলার বার্তা দিয়ে থাকে। এ নিয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই করে নেয়। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকা ও এর পার্শ¦বর্তী এলাকা সাভারের আশুলিয়া থেকে দু’টি বোমা উদ্ধার হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল বরিশালে বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন আহত হয়েছেন। গোয়েন্দারাও এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না।

তবে ঘটনাগুলোর নেপথ্যে কারা, সেটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। আগামী ৫ই আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও রেলপথ ঘিরে হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অবরোধের মাধ্যমে বিভিন্ন পয়েন্টে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের পরিকল্পনা করেছে ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগ। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশে সর্বোচ্চ সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আজকালের মধ্যেই সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আগামী ৫ই আগস্ট ঘিরে নাশকতার কোনো আশঙ্কা নেই। বলেন, আওয়ামী লীগের এত মুরোদ আছে বলে তো আমার মনে হয় না। একে তো নিষিদ্ধ ঘোষিত দল, মাফিয়া শক্তি। তারা মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এর বেশি তৎপরতা তো দেখি না। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগের তৎপরতা নিয়ে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন আছে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা তা নয়। আমাদের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এটা সবসময় চালু থাকে। যাতে আনঅ্যাটেন্ডেড কোনো ভেহিকেল না রাখে। টিমের পুরো সদস্য যেন একসঙ্গে চা খেতে না যায়, যেন গাড়ি রেখে সবাই একসঙ্গে বিশ্রাম না করে। কেউ না কেউ গাড়িটা অ্যাটেন্ড করবে। সব জায়গায় যাতে সতর্ক অবস্থান করে। এটা নরমাল প্র্যাকটিস।

গতকাল বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে একই পরিবারের তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেনÑ ওই এলাকার শাহ আলম হাওলাদারের স্ত্রী হনুফা বেগম, কন্যা ইতি ও নাতি ফাহিম। সকাল ৬টায় শাহ আলম হাওলাদারের বাড়ির পাশে থাকা বালুর বস্তার মধ্যে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলে থাকা তিনজন অগ্নিদগ্ধ হন। বিস্ফোরণের শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে।

গত ২৪শে জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমা উদ্ধার করা হয়। বোমাটি ছিল আইইডি প্রকৃতির। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় বোমার স্পিøন্টার চোখে লেগে মিরাজ আহমেদ (৩৩) নামে এক ব্যক্তি আহত হন। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে মতিঝিল স্টেশনের নিচতলায় (গ্রাউন্ড ফ্লোর) ডিজেল জেনারেটর রুমের পাশে একটি ছাতা ও একটি বালতি দেখতে পাওয়া যায়। ছাতার ভেতরে আলো জ্বলতে থাকায় বস্তুটি সন্দেহজনক হওয়ায় মেট্রোরেলের দায়িত্বরত আনসার সদস্য বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্টেশন কন্ট্রোলার ও এমআরটি পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে মতিঝিল থানা-পুলিশ, এমআরটি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরে বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়কারী দল, ডিএমপি ও ডিএমপি’র ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বোমা শনাক্ত করে এবং নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সফলভাবে বোমা নিষ্ক্রিয় করে।

গত ৩১শে জুলাই, সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। যেটির আকৃতি ছিল প্রেসার কুকারের মতো। আশুলিয়ার খেজুরবাগান এলাকার হৃদয় চাকমার মালিকানাধীন ‘জয়ী জেনারেল স্টোর’ নামের একটি চায়ের দোকানের সামনে একটি পরিত্যক্ত ব্যাগ দেখতে পান স্থানীয়রা। দীর্ঘ সময় ব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পরে ব্যাগটি খুলে ভেতরে প্রেসার কুকার আকৃতির একটি বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পেয়ে তারা আতঙ্কিত হয়ে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাটি ঘিরে ফেলে এবং বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিটকে জানায়। সিটিটিসি’র বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল পাশের একটি খোলা মাঠে নিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। ১লা আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে পৃথক দু’টি পরিত্যক্ত ব্যাগ ও বস্তা ঘিরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনটির কার্যক্রম সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধও রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় একটি সন্দেহজনক ব্যাগ এবং একই সময়ে ফার্মগেট স্টেশনের নিচতলায় একটি পিলারের পাশে একটি বস্তা পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে ডিএমপি’র বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়কারী দল ব্যাগ ও বস্তা পরীক্ষা করে দেখে, একটিতে পান-সুপারি ও জর্দার কৌটা এবং অন্যটিতে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে। ফলে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ৫ই আগস্ট ঘিরে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ওই দিনই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল। ছাত্র-জনতার জনরোষের মুখে পালিয়েছিলেন তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। তাই দিনটির নানা উদ্যাপনকে নস্যাৎ করতে নাশকতা, বোমাবাজি, চোরাগোপ্তা হামলা, পুলিশের গাড়িতে আক্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেÑ এমন ধারণাই করছেন গোয়েন্দারা। সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন বাজার ও নিমতলী রেলগেটে আকস্মিক ব্যারিকেড সৃষ্টির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর সড়ক ও রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করতে পারে। শ্রমিকদের ছদ্মবেশে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা গার্মেন্টে কৃত্রিম অসন্তোষ, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে উৎপাদন বন্ধ করে দেশের রপ্তানি আয়ে ধস নামাতে পারে।

একইসঙ্গে নিজেদের লোকবল প্রদর্শন করতে সাধারণ শ্রমিকদের জোরপূর্বক বা ভুল বুঝিয়ে ঝটিকা মিছিলে যোগ দেয়ানোর চেষ্টা করতে পারে। গাজীপুর ও টঙ্গীর ঘনবসতিপূর্ণ মেস বা বস্তি এলাকাকে ঢাল বানিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের বহিরাগত দুষ্কৃতকারীরা গোপন আস্তানা গড়ে তুলতে পারে। অলিগলিতে ১০-১৫ জনের ঝটিকা মিছিল বের করে ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথাও সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যানারে আকস্মিক শোডাউন দেয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বোমা-আতঙ্ক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই। তবে আমরা সব সময় সতর্ক থাকি। সিনিয়র অফিসাররা নিয়মিত তদারকি করেন। মাঠপর্যায়ে যারা দায়িত্ব পালন করি, তারা যেন আরও সতর্ক থাকি, সেজন্যই এই রিমাইন্ডার।

পুলিশ সদর দপ্তরের বার্তা নিয়ে তিনি বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বোমা-সংক্রান্ত ঘটনা এবং গুজব ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে পুলিশকে আবারো সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আগেও এ ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন