রেমিট্যান্সের টাকা সময়মতো আসে, পাসপোর্ট কেন আসে না?

রেমিট্যান্সের টাকা সময়মতো আসে, পাসপোর্ট কেন আসে না?

ফন্ট সাইজ:

প্রতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন রেমিট্যান্সের হিসাব প্রকাশ করে, তখন রাষ্ট্রের মুখে হাসি ফুটে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রাণ ফেরে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে প্রশংসার শেষ থাকে না। রাষ্ট্র তাদের বলে 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা'। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যোদ্ধারা যখন নিজের দেশের একটি বৈধ পাসপোর্টের জন্য মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, তখন রাষ্ট্র কোথায় থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে হাইকোর্টকে। একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে জনস্বার্থে করা রিটে আদালত বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের নতুন পাসপোর্ট ও নবায়নের ঝুলে থাকা আবেদন ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সে প্রশ্নও তুলেছেন। আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ নিছক বিচারিক নির্দেশ নয়; এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক কঠোর বার্তা।

প্রশ্ন হলো, একটি পাসপোর্ট কি আদালতের আদেশে পাওয়ার বিষয়? বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কর দেন। প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখেন। বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছে তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি কার্যকর নাগরিকসেবা। অথচ বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন জমা দিয়ে হাজারো মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। কেউ চাকরি হারান, কেউ ভিসা নবায়ন করতে পারেন না, কেউ অবৈধ অভিবাসীর ঝুঁকিতে পড়েন, কেউ কারাগারে যান, আবার কেউ বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে চলা একটি কাঠামোগত সংকট।

প্রশ্ন উঠতেই পারে সমস্যা কোথায়? দূতাবাস বলছে, আবেদন ঢাকায় আটকে আছে। ঢাকার দপ্তর বলছে, প্রিন্টিং চলছে। কোথাও জনবল সংকট, কোথাও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, কোথাও ফাইলের জট। কিন্তু একজন প্রবাসীর কাছে এসব ব্যাখ্যার কোনো মূল্য নেই। তিনি জানতে চান, নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাবেন কি না।
দুর্ভাগ্যজনক হলো, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা বলতে গেলে এখনও তৈরি হয়নি।
রিট আবেদনে সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ২১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। একজন বাংলাদেশি বিদেশে থাকলেও তিনি রাষ্ট্রের নাগরিক। তার সাংবিধানিক অধিকার দেশের ভেতরের নাগরিকের চেয়ে এক বিন্দুও কম নয়।
বাস্তবতা কিন্তু উল্টো কথা বলে। আজও অনেক দূতাবাসে একটি তথ্য জানতে দিনের পর দিন ফোন করতে হয়। ই-মেইলের উত্তর আসে না। আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলে না। অনলাইন ট্র্যাকিং অনেক ক্ষেত্রে কেবল আনুষ্ঠানিকতা। এই অবস্থাকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট সেবার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা কঠিন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। ২০২৪ সালে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থ শুধু রিজার্ভ বাড়ায়নি; লাখো পরিবারের জীবন বাঁচিয়েছে। গ্রামের অর্থনীতি সচল রেখেছে। একই সময়ে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন কর্মসংস্থানের জন্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি এখন প্রবাসীরা। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেই শক্তির মর্যাদা দিতে পেরেছে?
আমরা তাদের বিমানবন্দরে ফুল দিই, অনুষ্ঠানে সম্মাননা দিই, বক্তৃতায় যোদ্ধা বলি। কিন্তু একটি পাসপোর্ট সময়মতো দিতে পারি না। এই বৈপরীত্য যতদিন থাকবে, ততদিন "রেমিট্যান্স যোদ্ধা" শব্দটি অনেকের কাছেই রাজনৈতিক অলঙ্কার হিসেবেই থেকে যাবে।
হাইকোর্টের নির্দেশে হয়তো সাময়িকভাবে হাজারো আবেদন নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে- এরপর? আবার কি নতুন করে ফাইল জমবে? আবার কি মানুষ মাসের পর মাস অপেক্ষা করবে? আবার কি আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে? স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই সংকট ফিরবে!
প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার। বিদেশে জমা দেওয়া প্রতিটি আবেদন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, তা রিয়েল-টাইমে দেখা যেতে হবে। দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মধ্যে ডিজিটাল সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ জবাবদিহি ছাড়া কোনো সেবা ব্যবস্থার উন্নতি হয় না।
আরেকটি বিষয়ও অনিবার্যভাবে সামনে আসে। রাষ্ট্র যখন প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা আনার আহ্বান জানায়, তখন রাষ্ট্রেরও একটি নৈতিক দায়িত্ব তৈরি হয়। সেই দায়িত্ব শুধু নতুন শ্রমবাজার খোঁজা নয়; বিদেশে থাকা নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা।
কারণ একজন প্রবাসী যখন পাসপোর্টের অভাবে চাকরি হারান, তখন ক্ষতি শুধু তার নয়। ক্ষতি দেশেরও। কমে যায় রেমিট্যান্স, দুর্বল হয় অর্থনীতি, ক্ষুণ্ন হয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
হাইকোর্টের এই আদেশকে তাই একটি মামলার রায় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রকে আয়নায় নিজের মুখ দেখার সুযোগ দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই আয়নায় নিজের ব্যর্থতা দেখতে চায়, নাকি আরেকটি আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে।

শেষ কথা একটাই- প্রবাসীরা করুণা চান না। বিশেষ সুবিধাও চান না। তারা শুধু চান রাষ্ট্র তার ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করুক। যে রাষ্ট্র তাদের ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করে, সেই রাষ্ট্র যেন তাদের একটি বৈধ পাসপোর্ট পেতে আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য না করে।
রেমিট্যান্স সময়মতো দেশে আসে। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রও সময়মতো তার নাগরিকের পাশে দাঁড়াক।
"রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু রেমিট্যান্স গ্রহণে নয়, রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষের অধিকার রক্ষায়। আদালতের নির্দেশ সাময়িক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনই পারে এই সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটাতে।"
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন