বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টের অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির একটি ব্যর্থ ও বিতর্কিত পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা- ফিফা। এর মধ্যে তাদের এবং মার্কিন বিনিয়োগকারী ও ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতার ভাই জোশুয়া কুশনারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা।
ফুটবল বিশ্বের তীব্র প্রতিবাদ ও বয়কটের মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হলেও বিষয়টি আদালত, সালিশি কিংবা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় নিয়ে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে উয়েফা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য অ্যাথলেটিক-এর সূত্রে জানা গেছে, ইনফান্তিনো এবং বিনিয়োগ তহবিল ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’-এর প্রধান জোশুয়া কুশনারকে ৬ পৃষ্ঠার একটি পৃথক আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে উয়েফার আইনজীবী দল। এতে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এই পরিকল্পনা সম্পর্কিত সমস্ত দাপ্তরিক নথিপত্র, চুক্তিপত্র, কৌশলগত প্রস্তাবনা, আর্থিক মডেল এবং ইমেইল আদান-প্রদান সংরক্ষণের কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উয়েফা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, কোনো নথি মুছে ফেলা বা ধ্বংস করা হলে তা ‘প্রমাণ লোপাট’ (স্পয়লেশন অব এভিডেন্স) হিসেবে গণ্য করা হবে।
উয়েফার পাঠানো আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ‘উয়েফা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সতর্ক করছে যে, প্রস্তাবিত এফএফই পরিকল্পনা ও তৎসংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনি পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক সালিশি বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
৪.২ বিলিয়ন ডলারের গোপন চুক্তি ও বিশ্ব ফুটবলে তোলপাড়
ঘটনার নেপথ্যে ছিল ফিফার একটি অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক পদক্ষেপ। অলাভজনক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক সত্তা গঠন করে তার ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (৫১ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি) বিক্রি করার পরিকল্পনা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’ ছিল এর মূল ক্রেতা। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর সার্বিক বাজারমূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার ধরে এই হিসেব কষা হয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশকে লোভনীয় আর্থিক প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রতিটি দেশকে এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৭–২০৩০ চক্রে উন্নয়ন বাজেট বাড়িয়ে ২০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তবে ফুটবলের মৌলিক কাঠামো ও সঠিক নীতিমালার পরিপন্থী এই ‘পেছনের দরজার চুক্তি’ জানাজানি হতেই শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
সর্বাত্মক বয়কট ও ইনফান্তিনোর ওপর অনাস্থা প্রকাশ
উয়েফার জরুরি সভার পর ৫৫টি ইউরোপিয়ান সদস্য দেশ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়- এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তারা ফিফার সব টুর্নামেন্ট বয়কট করবে। পরবর্তীতে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা- কনকাক্যাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন- এফসিও উয়েফার সুরেই সুর মিলিয়ে ফিফার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানায়। চারদিক থেকে চরম চাপের মুখে পড়ে শুক্রবার ইনফান্তিনো ও ফিফা পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করে।
পরিকল্পনা বাতিল হলেও ফিফা প্রধানের প্রতি আস্থা ফিরে আসেনি। উয়েফা এক কড়া বিবৃতিতে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অপেশাদারিত্ব ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনে ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
উয়েফার বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘উয়েফাসহ ফুটবলের অন্যান্য কনফেডারেশন ও প্রধান অংশীদারেরা একযোগে এই এফএফই পরিকল্পনার চরম নিন্দা জানাচ্ছে। এটি ফুটবল পরিচালনার সার্বিক কাঠামোর সঙ্গে একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ।’
উয়েফার আইনজীবী দল আর্সেনালের সাবেক কোচ ও বর্তমানে ফিফার বিশ্ব ফুটবল উন্নয়ন প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার এবং আন্তর্জাতিক তারকা জিল এলিসসহ ফিফার ১৮ জন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে নোটিশ দিয়েছে, যেন তারা এই চুক্তি সম্পর্কিত সমস্ত নথি সুরক্ষিত রাখেন। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উয়েফার এই নোটিশের জবাব দিতে হবে এবং সমস্ত তথ্য অক্ষত আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।
