বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ হার্ট অ্যাটাক বা অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হন। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগী শুধু সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় মৃত্যুবরণ করেন বা স্থায়ীভাবে হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, যত দেরি হবে, তত বেশি হৃদ্পেশী নষ্ট হবে।
এই বাস্তবতা থেকে দেশের সব স্তরের স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে জাতীয় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম (এসিএস) নেটওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম।
কেন প্রয়োজন জাতীয় এসিএস নেটওয়ার্ক?
বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাকের রোগী প্রথমে গেলেও সেখানে সব সময় জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার সুযোগ থাকে না। ফলে রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে পাঠাতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান।
অন্যদিকে, রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরে আধুনিক ক্যাথল্যাব ও প্রাইমারি চঈও-এর সুবিধা থাকলেও দেশের অধিকাংশ মানুষ সেই সুবিধার বাইরে রয়েছেন। ফলে চিকিৎসায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হলে দেশের যেকোনো প্রান্তের রোগী দ্রুত সঠিক হাসপাতালে পৌঁছে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাবেন।
কীভাবে কাজ করবে এই নেটওয়ার্ক?
প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঐঁন-ধহফ-ঝঢ়ড়শব গড়ফবষ অনুসরণ করবে।
এর আওতায় পাঁচটি স্তরে চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
প্রথম স্তরে থাকবে কমিউনিটি ও প্রি-হাসপাতাল সেবা। সাধারণ মানুষকে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, টেলি-ইসিজি এবং রোগীকে দ্রুত সঠিক হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
দ্বিতীয় স্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ ঘণ্টা ইসিজি, টেলি-কার্ডিওলজি, উচ্চ সংবেদনশীল ট্রোপোনিন পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।
তৃতীয় স্তরে জেলা হাসপাতালে ঈযবংঃ চধরহ টহরঃ (ঈচট) গড়ে তোলা হবে, যেখানে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ট্রোপোনিন পরীক্ষা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া যাবে।
চতুর্থ স্তরে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা চালু
প্রাইমারি পিসিআই সেন্টার থাকবে। এখানে জরুরি এনজিওগ্রাম, স্টেন্ট প্রতিস্থাপন (প্রাইমারি পিসিআই), আইভিইউএস, ওসিটি, জড়ঃধনষধঃরড়হ এবং উন্নত কার্ডিয়াক কেয়ারের সুবিধা থাকবে।
সবচেয়ে জটিল রোগীদের জন্য পঞ্চম স্তরে জাতীয় কার্ডিয়াক ইনস্টিটিউট ও বিশেষায়িত কেন্দ্রগুলোতে উন্নত চিকিৎসা, ইসিএমও, জটিল পিসিআই, কার্ডিয়াক সার্জারি এবং গবেষণার সুযোগ থাকবে।
আন্তর্জাতিক সময়সীমা মেনে চিকিৎসা
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কে লক্ষ্য থাকবে
* হাসপাতালে আসার ১০ মিনিটের মধ্যে ইসিজি করা।
* ২৫ মিনিটের মধ্যে ঝঞঊগও শনাক্ত করা।
* প্রয়োজনে ৩০ মিনিটের মধ্যে থ্রম্বোলাইসিস শুরু করা।
* ৯০ মিনিটের মধ্যে প্রাইমারি পিসিআই সম্পন্ন করা।
* প্রথম চিকিৎসা সংস্পর্শ থেকে ১২০ মিনিটের মধ্যে ব্লক হওয়া ধমনী খুলে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়সীমা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
যেখানে প্রাইমারি পিসিআই সম্ভব নয়
বাংলাদেশের সব হাসপাতালে এখনই ক্যাথল্যাব স্থাপন সম্ভব নয়। তাই যেসব এলাকায় দ্রুত প্রাইমারি পিসিআই করা যাবে না, সেখানে রোগীকে প্রথমে জীবনরক্ষাকারী ঋরনৎরহড়ষুঃরপ ঞযবৎধঢ়ু দিয়ে পরে নির্ধারিত চঈও কেন্দ্রে পাঠানোর চযধৎসধপড়রহাধংরাব ঝঃৎধঃবমু অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় এই পদ্ধতি কার্যকর হিসেবে স্বীকৃত।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার
প্রস্তাবিত এসিএস নেটওয়ার্কে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে থাকবে-
* টেলি-ইসিজি
* এআই -ভিত্তিক ইসিজি বিশ্লেষণ
* অনলাইন রেফারেল
* অ্যাম্বুলেন্স জিপিএস ট্র্যাকিং
* ক্যাথ ল্যাব পূর্বেই সক্রিয় করার ব্যবস্থা
* ডিজিটাল রোগীর তথ্য সংরক্ষণ
* কেন্দ্রীয় জাতীয় এসিএস উযনড়ধৎফধং
ফলে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসক প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
জাতীয় এসিএস রেজিস্ট্রি কেন জরুরি?
প্রতিটি রোগীর চিকিৎসার তথ্য একটি জাতীয় ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে।
এতে জানা যাবে-
* কতজন রোগী হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন।
* কোথায় চিকিৎসায় দেরি হচ্ছে।
* কোন হাসপাতালে চিকিৎসার মান কেমন।
* কতজন রোগী সুস্থ হচ্ছেন বা মৃত্যুবরণ করছেন।
এই তথ্য ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, গবেষণা এবং চিকিৎসার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয়-
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, কার্ডিওলজিস্ট, নার্স, প্যারামেডিক, ক্যাথল্যাব কর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
কী পরিবর্তন আসবে? এসিএস
জাতীয় এসিএস নেটওয়ার্ক চালু হলে-
* দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও সময়মতো উন্নত চিকিৎসা পাবেন।
* হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
* হৃদ্যন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি ও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
* চিকিৎসায় আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে।
* আন্তর্জাতিক মানের জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
* গবেষণা ও স্বাস্থ্যনীতি আরও তথ্যভিত্তিক হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে হৃদরোগ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সময়সচেতন জাতীয় এসিএস নেটওয়ার্ক ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি নতুন স্বাস্থ্য প্রকল্প হবে না; বরং বাংলাদেশের জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে। এতে দেশের প্রতিটি নাগরিক, শহর বা গ্রামের ভেদাভেদ ছাড়াই, আন্তর্জাতিক মানের জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ লাভ করবে।
লেখক: অধ্যাপক , এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান,-কার্ডিওলজি বিভাগ পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
