‘প্রতিবার যেন এভাবে নিজের ভোটটা দিতে পারি’

ফন্ট সাইজ:

মাথায় টাক থাকলেও আরমানের বয়স ৩৬ পেরিয়েছে তা বোঝা যায় না। বরিশালের নাজিরের পুল এলাকায় চা বিক্রি করে ভালোই ইনকাম করে। সন্ধ্যায় ইফতারের পর চা খেতে খেতে আরমানের সঙ্গে কথা বলছিলাম। জীবনে সে এই প্রথমবার ভোট দিয়েছে। বয়স ৩৬। ১৮ বছর বয়সেই তো তার প্রথম ভোট দেয়ার কথা। আরমানের সহজ উত্তর, ২০০৮ সালে প্রথম যখন ভোট দিতে যান, চাচাত ভাই বললো, তুই বসে থাক, তোর ভোটটা আমি দিয়ে দেই। কোথায় আবার ভুল করবি। ভোট দিলো চাচাত ভাই, হাতে কালিও মেখে দিলো। এরপরের ভোটগুলোতে কেন্দ্রেই যাওয়া হয়নি। রাতে এসে নেতারা বলে গেছে, তোর ভোট দেয়া লাগবো না। আমরা আছি না? আর ২০১৮ সালের ভোট দিতে গিয়ে দেহি ভোট আগের রাইতেই সব শেষ। এবার ভোট দিয়েছি। মনটা তাই খুব ভালো। নতুন সরকারের কাছে কি আশা করোÑ জানতে চাইলে হেসে বললো, আমাগো আবার আশা। সব সরকারই মনে হয় এক। সারা দিনের রোজগার দিয়ে চাল ডাল কেনা যায় না। তবে একটা চাওয়া আছে বলেই একটু গম্ভীর হলো আরমান। এভাবে যেন প্রতিবছর আমার ভোটটা আমি দিতে পারিÑ এটাই চাওয়া।
স্কুলশিক্ষিকা রেহেনা পারভীন। কাউনিয়া এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক। বেতন ৫ হাজার টাকা। স্বামীর একটা ছোট দোকান আছে। টেনেটুনে চলে যায় মাসের দিনগুলো। একটি মেয়ে নিয়ে স্বপ্ন। বলেন, আগের সরকার টিসিবি, ওএমএস দিয়ে আমাদের রক্ষা করেছেন। বাজার থেকে তেল কিনতে হয় ২০০ টাকা লিটার আর টিসিবি থেকে ১২০ টাকা, ৪৫ টাকার আটা ২৪ টাকায়। নতুন সরকার টিসিবি, ওএমএস চালু রাখুকÑ এটা সবার আগে কামনা।
মাওলানা সিদ্দিক বাজার রোডের একটি ছোট মসজিদের ইমাম। শুক্রবার জুমার দিন যে দান পাওয়া যায় তা দিয়ে তার বেতন দেয়া হয়। সিদ্দিকের মতে এ টাকায় চলে না, এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী কিছু টাকা মাসে দান করেন। সব মিলিয়ে চলে যায়। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা কি জিজ্ঞাসা করতে বললো- নির্বাচনের আগে সরকার যে আশ্বাস দিয়েছিল তা পালন করা। ইমামদের মাসিক বেতন দেয়ার আশ্বাসটা মনে করিয়ে দিলেন। তিনিও যার ভোট সে দেবেÑ এবারের নির্বাচনে এই ধারা যেন অব্যাহত থাকে তার উপর গুরুত্ব দিলেন। এলাকায় কিশোর গ্রুপের সঙ্গে বসে রোজ আড্ডা দেয় রাজীব। বয়স ১৫ বছরের মতো। বিকাল, সন্ধ্যা, রাতেও এই গ্রুপকে দেখা যায়। তবে কিশোর সন্ত্রাসী বলা যায় না। আড্ডা দেয়া, মোবাইলে লুডুু খেলা, জোড় গলায় গান করা এই সব। তো রাজীবকে ডেকে কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানতে চাইলাম নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিষয়টি। তার সহজ প্রশ্ন কিন্তু উত্তরটা জটিল। পুলিশ কি পরিবর্তন হবে? মানে পুলিশের চরিত্র? মানেটা কি- জানতে চাইলে বললো, কয়েক বছর আগে বন্ধুরা গল্প করছিলাম। পুলিশ এসে বন্ধু রাহাতকে ধরে নিলো। ওর পকেটে নাকি গাঁজা পাওয়া গেছে। অথচ আমরা কেউ গাঁজা বা নেশা করি না। রাহাতের বাবা ভ্যানচালক। শেষ পর্যন্ত ভ্যান বিক্রি করে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনে। রাজীবের মতে পুলিশ সৎ এবং ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব পালন করলে সমাজটাই বদলে যাবে। বরিশালের সন্তান মিহির দত্ত ভোলায় একটি ব্যাংকে কাজ করেন। রোজ সকালে লঞ্চে করে ভোলা যান। কখনো রাত হয় বাসায় ফিরতে। তার আশাÑ নতুন সরকার ভোলা-বরিশালের সেতুটি করে দিবেন। তার মতে এতে দক্ষিণের অর্থনৈতিক চিত্রটাই বদলে যাবে। আসলে নতুন সরকারের কাছে কেউই আকাশচুম্বী কোনো আশা করে না। কেউ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বা দুবাই বানানোর কল্পনাও করে না। দু’মুঠো খাবার নিশ্চিতের পাশাপাশি একটা সহজ সরল জীবন আশা করে। আর আশা করে যার ভোট সে দেবে। অর্থাৎ ভোটাধিকার নিশ্চিত থাকা।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন